বাংলাদেশের পুরো ইতিহাস | History of Bangladesh

বাংলাদেশঃ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ)। ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়, পূর্ব সীমান্তে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মায়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণ উপকূলের দিকে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। 

ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের সিংহভাগ অঞ্চল জুড়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় ছেয়ে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ও দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ও ধ্রুপদী যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলটিতে বঙ্গ, পুণ্ড্র, গৌড়, গঙ্গাঋদ্ধি, সমতট ও হরিকেল নামক জনপদ গড়ে উঠেছিল। মৌর্য যুগে মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল অঞ্চলটি। জনপদগুলো নৌ-শক্তি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। মধ্য প্রাচ্য ও রোমান সাম্রাজ্যে মসলিন ও সিল্ক রপ্তানি করতো জনপদগুলো। 

প্রথম সহস্রাব্দিতে বাংলাদেশ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পাল সাম্রাজ্য, চন্দ্র রাজবংশ, সেন রাজবংশ গড়ে উঠেছিল। বখতিয়ার খলজীর গৌড় জয়ের পরে ও দিল্লি সালতানাত আমলে অত্র অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পরে। ইউরোপবাসীরা শাহী বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বাণিজ্য দেশ হিসেবে গণ্য করতো।

মুঘল আমলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের (জিডিপির) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হতো সুবাহ বাংলায়,যা সে সময় সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডটি প্রেসিডেন্সি বাংলার অংশ ছিল। ১৯৪৭-এর ভারত ভাগের পর বাংলাদেশ অঞ্চল পূর্ব বাংলা (১৯৪৭–১৯৫৬; পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৫৬–১৯৭১) নামে নবগঠিত পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। 

১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিবিধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তায় গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান "বাংলাদেশ" নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। 
বাংলাদেশঃ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ)। ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়, পূর্ব সীমান্তে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মায়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণ উপকূলের দিকে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ঘটেছে দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ; এছাড়াও প্রলম্বিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পুনঃপৌনিক সামরিক অভ্যুত্থান এদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বারংবার ব্যাহত করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি বিদ্যমান। 

সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি ও সমৃদ্ধি সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে।জনসংখ্যায় বিশ্বে অষ্টম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ, যদিও আয়তনে বিশ্বে ৯২ তম ৬টি ক্ষুদ্র দ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। 

মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলেরও কম এই ক্ষুদ্রায়তনের দেশটির প্রাক্কলিত (২০১৮) জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে জনবসতি ২৮৮৯ জন (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১১৫ জন)। দেশের জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা; সাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশ।

২০১৭–১৮ অর্থবছরে চলতি বাজারমূল্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ২২,৫০,৪৭৯ কোটি টাকা (২৬১.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা ২০১৮–১৯ অর্থবছরে বৃদ্ধি লাভ করে ২৮৫.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উন্নীত হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় বার্ষিক আয় ছিল ১ হাজার ৭৫২ ডলার। সরকার প্রাক্কলন করেছে যে, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৯৫৬ ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৯২ টাকা। 
দারিদ্রের হার ২৬.২০ শতাংশ, অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১১.৯০ শতাংশ, এবং বার্ষিক দারিদ্র হ্রাসের হার ১.৫ শতাংশ। এই উন্নয়নশীল দেশটি প্রায় দুই দশক যাবৎ বার্ষিক ৫ থেকে ৬.২ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনপূর্বক "পরবর্তী একাদশ" অর্থনীতিসমূহের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। 

রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরের পরিবর্ধন বাংলাদেশের এই উন্নতির চালিকাশক্তিরূপে কাজ করছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে কাজ করেছে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ত্বরিত বিকাশ এবং একটি সক্ষম ও সক্রিয় উদ্যোক্তা শ্রেণির আর্বিভাব। বাংলাদেশের রপ্তানীমুখী তৈরি পোশাক শিল্প সারা বিশ্বে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। জনশক্তি রপ্তানীও দেশটির অন্যতম অর্থনৈতিক স্তম্ভ। 
    বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্কলন এই যে ২০১৮–২০ এই দুই অর্থ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতি বছর গড়ে ৬.৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি লাভ করবে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের উর্বর অববাহিকায় অবস্থিত এই দেশটিতে প্রায় প্রতি বছর মৌসুমী বন্যা হয়; আর ঘূর্ণিঝড়ও খুব সাধারণ ঘটনা। 

    নিম্ন আয়ের এই দেশটির প্রধান সমস্যা পরিব্যাপ্ত দারিদ্র গত দুই দশকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে দ্রুত, জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অর্জিত হয়েছে অভূতপূর্ব সফলতা। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানব সম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। 

    তবে বাংলাদেশে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে যার মধ্যে রয়েছে পরিব্যাপ্ত পরিবারতন্ত্র, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে তলিয়ে যাবার শঙ্কা। তাছাড়া একটি সর্বগ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার রূপ নিয়ে নতুন ভাবে সামাজিক বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে।
    বাংলাদেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ও বিমসটেক-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া দেশটি জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্ব শুল্ক সংস্থা, কমনওয়েলথ অফ নেশনস, উন্নয়নশীল ৮টি দেশ, জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসি, ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংঘের সক্রিয় সদস্য।

    বাংলাদেশের শব্দের উৎপত্তির ও ইতিহাস-

    বাংলাদেশ শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত "নম নম নম বাংলাদেশ মম" ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত "আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে" এর ন্যায় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মাধ্যমে সাধারণ পরিভাষা হিসেবে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। অতীতে বাংলাদেশ শব্দটিকে দুটি আলাদা শব্দ হিসেবে বাংলা দেশ আকারে লেখা হত। ১৯৫০ দশকের শুরুতে, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীরা শব্দটিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল ও সভা-সমাবেশে ব্যবহার করতো। 

    বাংলা শব্দটি বঙ্গ এলাকা ও বাংলা এলাকা উভয়ের জন্যই একটি প্রধান নাম। শব্দটির প্রাচীনতম ব্যবহার পাওয়া যায় ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দের নেসারি ফলকে। এছাড়াও ১১-শতকের দক্ষিণ-এশীয় পাণ্ডুলিপিসমূহে ভাংলাদেসা পরিভাষাটি খুঁজে পাওয়া যায়।

    ১৪শ শতাব্দীতে বাংলা সালতানাতের সময়কালে পরিভাষাটি দাপ্তরিক মর্যাদা লাভ করে।১৩৪২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রথম শাহ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। উক্ত অঞ্চলকে বোঝাতে বাংলা শব্দটির সর্বা‌ধিক ব্যবহার শুরু হয় ইসলামী শাসনামলে। ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা অঞ্চলটিকে বাঙ্গালা নামে উল্লেখ শুরু করে।

    বাংলা বা বেঙ্গল শব্দগুলোর আদি উৎস অজ্ঞাত; ধারণা করা হয় আধুনিক এ নামটি বাংলার সুলতানি আমলের বাঙ্গালা শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক ধারণা করেন যে, শব্দটি বং অথবা বাং নামক একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি বা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বং জাতিগোষ্ঠী ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন।[৩৪] কিছু ঐতিহাসিকদের মতে, বং ছিলেন হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র, যেখানে হিন্দ ছিলেন হামের প্রথম পুত্র আর হামের পিতা ছিলেন নবী নূহ।

    অন্য তত্ত্ব অনুযায়ী শব্দটির উৎপত্তি ভাঙ্গা (বঙ্গ) শব্দ থেকে হয়েছে, যেটি অস্ট্রীয় শব্দ "বঙ্গা" থেকে এসেছিল, অর্থাৎ অংশুমালী।[৩৬] শব্দটি ভাঙ্গা এবং অন্য শব্দ যে বঙ্গ কথাটি অভিহিত করতে জল্পিত (যেমন অঙ্গ) প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেদ, জৈন গ্রন্থে, মহাভারত এবং পুরাণে। "ভাঙ্গালাদেসা/ ভাঙ্গাদেসাম" (বঙ্গাল/বঙ্গল)-এর সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ ৩-এর নেসারি ফলকে উদ্দিষ্ট (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দের আগে), যেখানে ভাঙ্গালার রাজা ধর্মপালের বৃত্তান্ত লেখা আছে।

    বাংলাদেশের ইতিহাস-২০২১ সংগ্রহ !

    বাংলাদেশের ইতিহাসঃবাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটি বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অংশে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অঞ্চলের প্রধান অংশের সাথে দেশটির সীমানা মিলেছে, যেখানে চার হাজারেরও বেশি বছর ধরে সভ্যতা চলছে, ক্যালকোলিথিক যুগেও। 
    এই বাংলার ইতিহাস অনেক গৌরবের এবং ত্যাগের ইতিহাস। এলাকাটির প্রারম্ভিক ইতিহাস হল ভারতীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং হিন্দু ও বৌদ্ধের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরে যখন মুসলিম অভিযাত্রীরা, যেমন তুর্কী, ইরানীয়, মুঘল প্রভৃতি এদেশে এসেছিল তখন ইসলাম ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসকরা মসজিদ এবং মাদ্রাসা নির্মাণের মাধ্যমে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে শক্তিশালী করে ।

    বাংলা শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে?

    বাংলা শব্দের উৎপত্তিঃ ৫৫১ খ্রিস্টাব্দে মহাজনপদ বঙ্গ (প্রাচীন রাজ্য); অধুনা বঙ্গ বা বাংলা ভূমি ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল , যা সুপ্রাচীন রাজ্য ও জনবসতি থেকে উদ্ভূত হয়।
    বাংলা বা বাংগালা শব্দটির সঠিক উৎপত্তিটি অজানা রয়েছে। সম্ভবত ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি এ অঞ্চলে বসবাসকারী দ্রাবিড় গোষ্ঠী বঙ থেকে বঙ্গ শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। 

    অন্যান্য তথ্যসূত্র থেকে ধারণা করা হয় যে অস্ট্রিক জাতির সূর্যদেবতা "বোঙ্গা" থেকে বঙ্গ কথাটির উদ্ভব হয়েছে। মহাভারত, পুরাণ ও হরিবংশের মতে রাজা বলির বঙ্গ নামে এক ক্ষেত্রজ পুত্র ছিলেন যিনি বঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের নেসারী শিলালিপিতে প্রথম বঙ্গলা শব্দটির উল্লেখ রয়েছে যেখানে ধর্মপালকে বঙ্গলার রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুলতান ইলিয়াস শাহ "শাহ-ই-বাঙ্গালাহ" নামক উপাধি গ্রহণ করেন এবং তারপর থেকে সকল মুসলিম সূত্রেই বাংলাকে বাঙ্গালাহ বলা হয়েছে।

    প্রাচীন বাংলার ইতিহাস

    প্রাচীন বাংলার ইতিহাসঃ বাংলাদেশে সংগঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজগুলি ভারতীয় উপমহাদেশের NBPW যুগের (৭০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নিদর্শন প্রকাশ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে লৌহ যুগের সংস্কৃতি প্রায় ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় এবং ৫০০-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। উত্তর ভারতের ১৬টি মহা রাজ্য বা মহাজনপদের উত্থান এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পরবর্তী উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে এই যুগ বিরাজমান ছিল।[৩] প্রাচীণ ভারতের পূর্বাঞ্চল, বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ বা প্রাচীণ বঙ্গ রাজ্য এই মহাজনপদগুলির অংশ ছিল, যা ষষ্ঠ শতকে সমৃদ্ধ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

    ভাষা গতভাবে, এই ভূখণ্ডের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী হয়তো দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলত যেমন কুরুক্স, বা সম্ভবত অস্ট্রো-এশীয় ভাষায় কথা বলত যেমন সাঁওতাল। পরবর্তীকালে, তিব্বতী-বার্মানের মতো অন্যান্য ভাষা পরিবারের লোকেরা বাংলায় বসতি স্থাপন করে। সপ্তম খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল মগধের অংশ হিসেবে ইন্দো-আর্য সভ্যতার অংশ হয়ে উঠেছিল। নন্দ রাজবংশ হচ্ছে প্রথম ঐতিহাসিক রাষ্ট্র যা ইন্দো-আর্য শাসনের অধীনে বাংলাদেশকে একত্রিত করেছিল। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের উত্থানের পর অনেক পুরোহিত ধর্ম বিস্তারের জন্য এখানে বসতি স্থাপন করেছিল এবং মহাস্থানগড়ের মতো অনেক স্তম্ভ স্থাপন করেছিল।

    বিদেশিদের নিয়ে ইতিহাস

    বিদেশী ইতিহাসঃ বাঙ্গালী জাতি প্রাচীন ভারতের একটি পরাক্রমশালী সমুদ্র অভিযাত্রী জাতি ছিল। শুধু বাঙ্গালী জাতিই নয়, প্রাচীনকালে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জাতি, যেমন বাঙ্গালী, কলিঙ্গী, তামিল প্রভৃতি জাতি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় নানা উপনিবেশ গড়ে তুলতেন। তারা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এরকম একটি বিরাট সভ্যতাও গড়ে তুলেছিলেন। এটি শ্রীবিজয়া সভ্যতা নামে পরিচিত। 

    ভিয়েতনামের ইতিহাসে উল্লেখ আছে ভারতবর্ষের বন-লাং (বাংলা) নামক দেশ থেকে লাক লোং (লক্ষণ?) নামক এক ব্যক্তি ভিয়েতনামে গিয়ে "বন-লাং" নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই বন-লাং যে ভারতবর্ষের বাংলা সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই বাঙালীদের রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। 

    অপরদিকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে উল্লেখ আছে বঙ্গ দেশ থেকে আগত বিজয় সিংহ নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় দ্রাবিড় রাজাদের পতন ঘটিয়ে সিংহল (সিংহ বংশীয়) নামে একটি নতুন রাজ্যের পত্তন করেন। বিজয় সিংহকে সিংহলী জাতির পিতা হিসেবে পরিগণিত করা হয়। বিজয় সিংহকে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় একটি মহাকাব্যও রয়েছে যা "মহাবংশ" নামে পরিচিত।

    নন্দ সাম্রাজ্য ইতিহাস

    নন্দ সাম্রাজ্যঃনন্দ সাম্রাজ্য ছিল বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় যুগ। এই যুগে বাংলার শক্তিমত্তা ও প্রাচুর্য শীর্ষে আরোহণ করে। এই যুগে বাংলা সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। নন্দ রাজাদের জন্ম হয়েছিল বাংলায়। 

    তারা বাংলা থেকে মগধ (বিহার) দখল করে এবং উভয় রাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে বঙ্গ-মগধ নামে একটি নতুন সাম্রাজ্যের পত্তন করে। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসে বাংলাকে গঙ্গারিডাই এবং মগধকে প্রাসি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রিক ইতিহাসে এই সংযুক্ত রাজ্যকে গঙ্গারিডাই ও প্রাসি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

    মহাপদ্ম নন্দ ছিলেন নন্দ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কোশল (উত্তর প্রদেশ), কুরু (পূর্ব পাঞ্জাব), মৎস্য (রাজপুতানা), চেদী (মধ্য প্রদেশ ও বিহারের মধ্যস্থিত জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল),অবন্তী (মধ্য প্রদেশ) প্রভৃতি অঞ্চল জয় করেন। 

    দিগ্বিজয়ার্থে মহাপদ্ম এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন। তৎকালীন ইতিহাস অনুসারে মহাপদ্মের অধীনে ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ অশ্বারোহী, ৪,০০০ যুদ্ধরথ ও ২,০০০ হস্তীবাহিনী ছিল। মতান্তরে তার নিকট ২,০০,০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী, ৮,০০০ যুদ্ধরথ ও ৬,০০০ হস্তীবাহিনী ছিল।

    "কথাসরিৎ সাগর" থেকে জানা যায় তিনি দক্ষিণ ভারতেরও বিরাট অংশ জয় করেছিলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের কলিঙ্গ ও অশ্মক এ রাজ্য দুটো জয় করেছিলেন। অশ্মক হচ্ছে মহারাষ্ট্রের পূর্ব অংশে একটি প্রাচীন রাজ্যের নাম। এটি দক্ষিণ ভারতে আর্যদের একটি বিখ্যাত উপনিবেশ ছিল। কলিঙ্গ হচ্ছে উড়িষ্যার প্রাচীন নাম। কলিঙ্গের হস্তিগুম্ফ শিলালিপি থেকে জানা যায় মহাপদ্ম কলিঙ্গে জল সেচের জন্য একটি বিরাট জল প্রণালী নির্মাণ করেছিলেন। তিনি কলিঙ্গ থেকে একটি জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তিও রাজধানীতে নিয়ে যান। 

    মহাপদ্ম ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হন। সমগ্র ভারতবর্ষ জয় করে তিনি একরাট উপাধি গ্রহণ করেন। পরে তাকে অনুসরণ করে পশ্চিম ভারতের রাজারা বিরাট ও দক্ষিণ ভারতের রাজারা সম্রাট উপাধি গ্রহণ করে।

    মহাপদ্ম নন্দের পর ক্ষমতায় আসীন হন তার পুত্র ধননন্দ বা উগ্রনন্দ। ধননন্দের সময় রাজ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখা দেয়। ধননন্দের সময়ে পাটলিপুত্রে পাঁচটি ধর্মস্তূপ নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীণ ভারতের বিভিন্ন ইতিহাসে ধননন্দকে অর্থপিপাসু রূপে উল্লেখ করা হয়েছে ।

    উগ্রনন্দের বা ধননন্দের সময় গ্রিক সম্রাট আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। কিন্তু উগ্রনন্দ একটি বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে আলেকজাণ্ডারের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হন। প্লুটার্ক বলেছেন, রাজা পুরুষোত্তমের (পোরাস) সাথে যুদ্ধের পর মেসিডোনিয়ার সৈন্যরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এবং ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে আরও প্রবেশের জন্য অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। 

    তারা জানতে পারে গঙ্গা নদী যা ২৩০ স্টেডিয়া বিস্তৃত ছিল এবং ১০০০ ফুট গভীর ছিল, তার পাশের সমস্ত তীর সশস্ত্র যোদ্ধা, ঘোড়া এবং হাতি দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবৃত ছিল। গঙ্গারিডাই ও প্রাসি এর রাজা তার (আলেকজান্ডার) জন্য ২,০০,০০০ পদাতিক, ৮০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী, ৮,০০০ যুদ্ধরথ ও ৬,০০০ হস্তিবাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

    ইতিহাস-মৌর্য সাম্রাজ্য

    মৌর্য সাম্রাজ্য:-মৌর্য সাম্রাজ্যেরশাসনকালে মহাস্থান (পুণ্ড্রনগর) কেন্দ্রীয় অঞ্চল ছিল বলে ধারণা করা হয়। তৃতীয় মৌর্য সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা শিলালিপি এখানে পাওয়া গিয়েছে।

    কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে (মৌর্য শাসনকালীন গ্রন্থ) বলেছেন, পুণ্ড্রের কৌষেয় বস্ত্র মরকত মণির মতো মসৃণ। একে পৌণ্ড্রিকা বলা হয়েছে।[৮] এ ধরনের বস্ত্র শুধু মগধ ও পুণ্ড্রে উৎপন্ন হতো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ গ্রন্থে বঙ্গের এক প্রকার বস্ত্রকে "বাঙ্গিকা" বলা হয়েছে যা শ্বেত বর্ণের হতো। সর্বোপরি এ গ্রন্থে বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের প্রশংসা করা হয়েছে।

    পাল রাজবংশের ইতিহাস

    পাল রাজবংশঃ পাল সাম্রাজ্যের যুগ ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল যুগ। এ সময় বাংলার ইতিহাসে আবার দিগ্বিজয়ের সূচনা হয়। পাল রাজাগণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে। একারণে পাল শিলালিপিতে বরেন্দ্রকে জনকভূ বা রাজ্যাম পিত্রাম বলা হয়েছে। পাল সাম্রাজ্যের রাজাগণ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। পাল রাজাগণ ছিলেন প্রথমত বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও পরবর্তীতে তান্ত্রিক শাখার অনুসারী। পাল বংশীয় রাজাগণ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রভূমি কনৌজ দখলের জন্য রাজপুতানার গুর্জর এবং দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূটদের সাথে এক প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই ভয়ঙ্কর ও ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধ পরবর্তী দুই শত বৎসর অব্যাহত থাকে।

    পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা গোপাল। তিনি ৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা দেশ শাসন করেন। গোপালের আগমনের পূর্বে বাংলাদেশ পাচটি খণ্ডে বিভক্ত ছিল যথা- অঙ্গ, বঙ্গ, গৌড়, সুহ্ম ও সমতট। গোপাল এই সমস্ত খণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ করেন ও বাংলাদেশে শান্তি শৃঙ্খলা আনয়ন করেন।গোপাল বিহার, উড়িষ্যা ও কামরূপও দখল করেন। এরপর গোপাল উত্তর ভারতের রাজধানী কনৌজ অক্রমণ করেন। তিনি কনৌজের আয়ুধ বংশীয় রাজা বজ্রায়ুধকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। কিন্তু গুর্জর রাজা বৎসরাজের নিকট তিনি পরাজিত হন। বৎসরাজ পরবর্তীতে রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব ধারাবর্ষের নিকট পরাজিত হন। ফলে গোপাল তার সাম্রাজ্য রক্ষা করতে সক্ষম হন।

    গোপালের পুত্র ধর্মপাল (৭৯০-৮১০) ছিলেন একজন সুদক্ষ ও পরাক্রমশালী সম্রাট। তিনি উত্তর ভারতে আক্রমণ করেন এবং গুর্জর রাজা নাগভট্টকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। তিনি সমগ্র উত্তর ভারতব্যাপী বিশাল সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছিলেন। 

    খালিমপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় তিনি মদ্র (পাঞ্জাব), গান্ধার (খাইবার প্রদেশ), মৎস্য ([[রাজস্থান|রাজপুতানা), যদু(গুজরাট), অবন্তী (মধ্য প্রদেশ) প্রভৃতি অঞ্চল বিজয় করেছিলেন। কিন্তু এ অঞ্চলগুলো তিনি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন নি। ধর্মপাল সেনাপতি লাউসেনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রকূট রাজাকে পরাজিত করে উড়িষ্যা পুনর্দখল করতে সক্ষম হন। এই ঘটনাটি তৎকালীন বিখ্যাত মহাকাব্য ধর্ম মঙ্গলে উল্লেখ আছে।

    ধর্মপালের সুযোগ্য পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০) পুনরায় সমগ্র ভারতব্যাপী তার অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে কম্বোজ (কাশ্মীর) পর্যন্ত তার সমরাভিযান পরিচালনা করেন। দেবপাল গুর্জর রাজা রামভদ্রকে পরাজিত করে তাকে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। বিন্ধ্যা পার্বত্য অঞ্চল বিজয় করে তিনি মালব ও গুজরাট দখল করেন। কিন্তু এ অঞ্চলগুলো পরবর্তীতে তিনি মিহির ভোজ|মিহির ভোজের কাছে হারিয়ে ফেলেন। দেবপালের দাক্ষিণাত্য অভিযান সফল হয়েছিল। তার নির্দেশে ভ্রাতা জয়পাল রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষকে পরাজিত করে উড়িষ্যা পুনর্দখল করেন। এরপর উড়িষ্যা চিরস্থায়ীভাবে পাল সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল।

    পাল সম্রাটগণ বহু বৌদ্ধবিহার ও ধর্মীয় পীঠস্থান নির্মাণ করেছিলেন। বিক্রমশীল, ওদন্তপুরী ও জগদ্দল প্রভৃতি বৃহদায়তন মহাবিহার পাল স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পাল সম্রাটগণ প্রথমত "মহাযান" বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে পালগণ হিন্দুদের বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট করার জন্য তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন করেন। বহু হিন্দু দেবদেবীকে এই ধর্মে স্থান দেওয়া হয়। 

    পাল সম্রাটগণ সংস্কৃত বা পালি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। পাল রাজাদের সময়ই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীণতম নিদর্শন চর্যাপদসমূহ রচিত হয়। তাই পাল রাজবংশকে অনেক সময় বাংলা সাহিত্যের জনক মনে করা হয়।

    সেন বংশের ইতিহাস

    সেন রাজবংশঃ সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন প্রাথমিক জীবনে পাল রাজাদের অধীনে দক্ষিণবঙ্গের এক সামন্তপ্রভু ছিলেন। পরে তিনি নিজ বাহুবলে সাম্রাজ্য বিস্তার করে পূর্ববঙ্গের বর্মণ রাজাদের পরাজিত করেন। তিনি উত্তরবঙ্গের এক যুদ্ধে পাল সম্রাট মদনপালকে পরাজিত করে রাজধানী গৌড় দখল করেন। তিনি ত্রিহুত (উত্তর বিহার) ও কামরূপও (পশ্চিম আসাম) জয় করে নেন। 

    তবে তিনি দক্ষিণ বিহার জয় করতে ব্যর্থ হন। পাল রাজাগণ এখানে গাহড়বাল সাম্রাজ্যের সহায়তায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। বিজয়সেন শৈব ধর্মের ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তার সময় কনৌজ, অযোধ্যা ও হরিদ্বার থেকে যেসমস্ত কায়স্থ এদেশে আসেন তারাই মূলত বাঙালী কায়স্থদের আদিপুরুষ।

    বল্লাল সেন বিজয়সেনের পর বাংলার সিংহাসনে আসীন হন। বল্লাল সেন তার রাজ্যের প্রায় ১,০০০ ব্রাহ্মণকে চিহ্নিত করেন। এদেরকে রাজ পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সংবদ্ধ করা হয় এবং এদের উচ্চ পদ মর্যাদা প্রদান করা হয়। এই মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ রাজ্যে কুলীন নামে পরিচিত হয়। বল্লাল সেন একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। 

    তিনি দানসাগর ও অদ্ভুতসাগর নামে দুইটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থ দুটো থেকে তার অভূতপূর্ব প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। বল্লাল সেনের সময় বঙ্গদেশে শৈব, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক প্রভৃতি বিভিন্ন মতবাদ দেখা দেয়। বল্লালসেন ব্যক্তিগতভাবে তান্ত্রিক মতের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, যদিও তার পিতা বিজয়সেন শৈব মতের অনুসারী ছিলেন।

    বল্লাল সেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন সিংহাসনে আসীন হন। পিতার মত লক্ষণ সেনও সাহিত্য ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তার সময়ে রাজ্যে বহু প্রতিভাবান কবির আবির্ভাব হয়। যেমন শরণ, হলায়ুধ, উমাপতিধর প্রমুখ। ধর্মীয় মতের দিক থেকে লক্ষণ সেন ছিলেন বৈষ্ণব। আনুলিয়ায় প্রাপ্ত তাম্র শাসনে লক্ষণ সেনকে পরমবৈষ্ণব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

    লক্ষণ সেনের সময় বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। এসময় লক্ষণ সেন নদীয়ার একটি তীর্থকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজী অতর্কিতে নদীয়া আক্রমণ করেন যার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। লক্ষণ সেন পূর্ব বঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন, মুসলমানরা পূর্ববঙ্গ জয় করতে ব্যর্থ হয়।

    দেব রাজত্বের ইতিহাস

    দেব রাজত্বঃ দেব রাজ্য ছিল বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে আরাকানের দান্যবতী বংশের একটি রাজ্য। এই রাজ্যটি বিস্তৃত ছিল আরাকান হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং এর রাজধানী ছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু স্থানীয় বাঙালী প্রভাবে দেব রাজাগণ বাঙ্গালী ও হিন্দু হয়ে পড়ে। এই রাজবংশের প্রথম শাসক ছিলেন পুরুষোত্তম দেব, যিনি প্রথম জীবনে একজন সাধারণ গ্রামিক (গ্রাম প্রধান) ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি সেন সম্রাটদের অধীনে দক্ষিণাঞ্চলের প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে উন্নীত হন। 

    তার পুত্র মধুসূদন দেব প্রথম সেন সাম্রাজ্যের হাত থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নৃপতি উপাধি ধারণ করেন। দামোদর দেব এই রাজবংশের একজন শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তার রাজত্ব বর্তমান কুমিল্লা-নোয়াখালী-চট্টগ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।

    এই রাজবংশের পরবর্তী শাসক দশরথ দেব এই বংশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী শাসক ছিলেন। তিনি সেন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটান এবং সমগ্র পূর্ববঙ্গ ( ঢাকা-ময়মনসিংহ-খুলনা) অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের সাথে মিত্রতা করে আগ্রাসনকারী মুঘীসউদ্দীন তুঘরলকে পরাজিত করেন এবং বাংলার হিন্দু সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেন। 

    এ উপলক্ষে তিনি দনুজ মর্দন দেব উপাধি গ্রহণ করেন। গিয়াসউদ্দীন বলবনের ইতিহাসে তাকে দনুজ রায় বলে অভিহিত করা হয়েছে। দেব বংশ আরও কিছুকাল তার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। যদিও এই সময়কার রাজাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অবশেষে বাংলার মাহমুদ শাহী সুলতান ফিরোজ শাহের আক্রমণে দেব রাজবংশের পতন হয়।

    মধ্যযুগ এবং ইসলামী শাসন ইতিহাস

    মধ্যযুগ এবং ইসলামী শাসনঃ সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলিম ব্যবসায়ী ও সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় প্রথম ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। দ্বাদশ শতকে মুসলিমরা বাংলায় বিজয় লাভ করে এবং তারা ঐ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১২০২ সালের শুরুর দিকে দিল্লী সালতানাত থেকে একজন সামরিক অধিনায়ক বখতিয়ার খিলজী বাংলা ও বিহারকে পরাজিত করেছিলেন। 

    প্রথমদিকে বাংলা তুর্কী জাতির বিভিন্ন গোত্র দ্বারা শাসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে আরব, পারসীয়, আফগান, মুঘল প্রভৃতি অভিযানকারী জাতি দ্বারা বাংলা শাসিত হয়। মুসলিম শাসকদের অধীনে বাংলা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। কারণ শহরগুলো উন্নত হয়েছিল; প্রাসাদ, দুর্গ, মসজিদ, সমাধিসৌধ এবং বাগান; রাস্তা এবং সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল; এবং নতুন বাণিজ্য পথগুলো সমৃদ্ধি ও নতুন সাংস্কৃতিক জীবন বয়ে নিয়ে এসেছিল।

    খিলজী শাসন ইতিহাস

    খিলজী শাসনঃ বখতিয়ার খিলজী ১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বিহার আক্রমণ করেন। তিনি বিহারের পাল রাজবংশের অবশিষ্টাংশের পতন ঘটিয়ে বিহার দখল করেন। বখতিয়ার খিলজী এরপর বাংলা আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ১২০৪ সালে ১৭ সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তীর্থকেন্দ্র নদীয়ায় আক্রমণ করেন। 

    লক্ষণ সেন পলায়ন করেন এবং তিনি পূর্ব বঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মুসলমানদের কোন নৌবাহিনী না থাকায় তারা পূর্ববঙ্গ দখল করতে পারেনি। উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এরপর তিব্বত আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১২০৬ সালে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি তিব্বতে আক্রমণ করেন। এবং তিব্বতের কারামাত্তান নগর পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু প্রচণ্ড শীত ও রসদপত্রের অভাবে বখতিয়ার খিলজীর এ অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

    বখতিয়ার খিলজীর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হয়। বখতিয়ারের অন্যতম সহকারী শিরণ খিলজী নিজেকে বাংলার সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সিংহাসনের অপর দাবিদার মর্দান খিলজী শিরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। শিরণ মর্দানকে পরাজিত ও বন্দি করেন। 

    মর্দান খিলজী দিল্লীর সম্রাট কুতুবউদ্দিন আইবেককে বাংলা আক্রমণের জন্য আহ্বান জানান। আইবেকের সেনাপতি কায়েমাজ রূমী শিরণকে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন, এবং মর্দান খিলজীকে বাংলার গভর্নর নিয়োগ করা হয়। মর্দান প্রথমত দিল্লীর অধীনস্থ থাকেন, কিন্তু কুতুবউদ্দীন আইবেকের মৃত্যুর পর তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মর্দান ক্রমশ অত্যাচারী হয়ে উঠলে খিলজী অমাত্যগণ তাকে হত্যা করেন এবং ইওয়াজ খিলজীকে বাংলার সুলতান মনোনীত করেন।

    ইওয়াজ খিলজী একজন সুদক্ষ ও রণকুশলী সম্রাট ছিলেন। তিনি একটি নৌবাহিনী গঠন করেন এবং এই নৌবাহিনীর সাহায্যে তিনি বঙ্গ দখল করেন। তিনি বিহার, উড়িষ্যা ও কামরূপও (পশ্চিম আসাম) দখল করেন। কিন্তু ইওয়াজ এইসমস্ত রাজ্য সরাসরি রাজ্যভুক্ত করেননি, তিনি এই রাজ্যগুলোকে সামন্ত রাজ্যের মর্যাদা প্রদান করেন। 

    ইওয়াজের এই রাজ্য বিস্তারের ফলে ১২২৫ সালে দিল্লীর সুলতান শামসউদ্দীন ইলতুতমিশ তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। যুদ্ধে ইওয়াজ পরাজিত হন। কিন্তু ইলতুতমিশ দিল্লী প্রত্যাবর্তন করলে ইওয়াজ পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এবার যুদ্ধে ইলতুতমিশের পুত্র মাহমুদ নেতৃত্ব দেন, এবং যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ইওয়াজের পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে।

    মামলুক শাসন ইতিহাস

    মামলুক শাসনঃ মামলুকগণ ছিলেন তুর্কী জাতির একটি বিশেষ ধরনের ভাড়াটে সেনাবাহিনী। দিল্লীতে এই সময় মামলুকগণই অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং দিল্লী কর্তৃক নিয়োগকৃত বাংলার সকল গভর্নরগণও ছিলেন মামলুক। বাংলার মামলুক সুলতান তুঘরল তুঘান খান ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর বিরুেদ্ধ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। 

    তিনি শুধু বাংলার উপরই আধিপত্য বিস্তার করলেন না, তদুপরি এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং বিহার ও বদায়ুন অঞ্চল নিজের শাসনাধীনে আনেন। যাই হোক দিল্লীর শাসনকর্তা তমর খানের নির্দেশে এক সেনাবাহিনী বাংলার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তুঘান খান পরাজিত হন এবং শেষ পর্যন্ত দিল্লীর শাসন মেনে নেন।

    ১২৫১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার গভর্নর মুঘীসউদ্দীন ইউজবাক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইউজবাক বাংলার দক্ষিণ দিক হতে আগত উড়িষ্যার একটি আক্রমণ প্রতিহত করেন। তিনি উড়িষ্যার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এর রাজধানী লুণ্ঠন করেন এবং একটি শ্বেত হস্তীও লাভ করেন। তুঘানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইউজবাক বিহার ও আউয়াধ দখল করেন। 

    এর ফলে তিনি পূর্ব ভারতব্যাপী এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে পড়েন। ইউজবাক যতদিন জীবিত ছিলেন দিল্লীর সম্রাট ততদিন পর্যন্ত তাকে পরাজিত করতে পারেননি। ইউজবাক উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসামও দখল করেন। কিন্তু আসামের একটি বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে তিনি নিহত হন।

    দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের সময় বাংলার গভর্নর মুঘীসউদ্দীন তুঘরল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি সমগ্র বাংলা ও বিহারের ওপর আধিপত্য স্থাপন করে উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং তা তার সাম্রাজ্যভূক্ত করেন। সম্রাট বলবন মালিক তুরমতীকে এক বিরাট বাহিনী দিয়ে বাংলার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি মুঘিসউদ্দীন তুঘরলের হাতে পরাস্ত হন। 

    বলবন এবার দ্বিতীয় অভিযান প্রেরণ করেন সেনাপতি শিহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে। কিন্তু তিনিও তুঘরলের হাতে পরাজিত হন। এর ফলে বলবন ১২৮০ সালে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে স্বয়ং বাংলা অভিযান করেন। তুঘরল প্রবল পরাক্রমের সাথে যুদ্ধ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।

    মাহমুদ শাহী রাজবংশ ইতিহাস

    মাহমুদ শাহী রাজবংশঃ সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বুঘরা খান বাংলা দেশে একটি স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। তিনি মাহমুদ শাহ উপাধি গ্রহণ করেন, এজন্য তার বংশ মাহমুদ শাহী বংশ নামে পরিচিত হয়ে থাকে। দিল্লীর সম্রাট ছিলেন মাহমুদ শাহের পুত্র কায়কোবাদ। কিন্তু তিনি দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী নিজামউদ্দীনের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে পড়েন। 

    মাহমুদ শাহ তার পুত্রকে উদ্ধারের জন্য এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। দিল্লীর উজির নিজামউদ্দীন এক বিরাট বাহিনী নিয়ে সরযু নদীর তীরে তার গতিরোধ করেন। যাই হোক বাংলা ও দিল্লীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ না হয়ে উভয়পক্ষের মধ্য সমঝোতা হয়। মাহমুদ শাহ তার বাহিনী নিয়ে লখনৌতিতে ফিরে আসেন ও সগৌরবে রাজত্ব করতে থাকেন। অপরদিকে দিল্লীতে তার নির্দেশে সুলতান কায়কোবাদ মন্ত্রী নিজামউদ্দীনকে পদচ্যুত করে রাষ্ট্রকে নিষ্কণ্টক করেন।

    মাহমুদ শাহের পর তার পুত্র রুকুনউদ্দীন কায়কাউস বাংলার সিংহাসনে আসীন হন। রুকুনউদ্দীন কায়কাউসের সময় দিল্লীর সুলতান ছিলেন আলাউদ্দীন খিলজী। ১৩০১ সালে আলাউদ্দীন খিলজী বাংলা আক্রমণ করেন। যুদ্ধে কায়কাউস পরাজিত ও নিহত হন। খিলজী কায়কাউসের ভাই ফিরোজ শাহকে তার গভর্নর হিসেবে বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। 

    ফিরোজ শাহ একজান খ্যাতিমান বিজেতা ছিলেন। তিনি খিলজীর নির্দেশে পূর্ববঙ্গ আক্রমণ করেন এবং দেব বংশকে সমূলে উৎখাত করেন। এর ফলে পূর্ববঙ্গ চিরস্থায়ী ভাবে মুসলিন শাসনাধীনে চলে আসে। তার সময়েই বিখ্যাত আউলিয়া শাহ জালাল বঙ্গদেশে আগমন করেছিলেন এবং সিলেট জয় করেছিলেন। আলাউদ্দীন খিলজীর মৃত্যুর পরে তিনি স্বাধীনতা অর্জন করেন এবং কিছুদিন স্বাধীনভাবে রাজকার্য করার পর মৃত্যুবরণ করেন।

    ফিরোজ শাহের পর তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী বাহাদুর শাহ সমগ্র বাংলার অধিপতি হন। কিন্তু এ সময় দিল্লীর তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাদেশে সমরাভিযান করেন। ষড়যন্ত্রকারী ভ্রাতা নাসিরউদ্দীন ইব্রাহীমের সহায়তায় রাজধানী লখনৌতি আক্রমণ করেন এবং বাহাদুর শাহ পরাজিত হন। 

    গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে সাতগাও, লখনৌতি ও সোনারগাঁও এই তিন ভাগে ভাগ করেন এবং এই তিন ভাগকে তিনজন পৃথক শাসকের হাতে নিযুক্ত করেন। কিন্তু গিয়াসউদ্দীন তুঘলক প্রত্যাবর্তন করলে বাহাদুর শাহ পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সাতগাওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খান তার বিরুদ্ধে সমরাভিযান করেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।

    ইলিয়াস শাহী রাজবংশ

    ইলিয়াস শাহী রাজবংশঃ ইলিয়াস শাহ বাংলাদেশে ইরানের সিজিস্তান হতে আগত এক উদ্বাস্তু ছিলেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে বাংলায় নিযুক্ত দিল্লীর গভর্নর আলী শাহের সিলাহদার ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে বাংলার সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। ইলিয়াস শাহ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা দখল করে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে এক বিশাল সাম্রাজ্য কায়েম করেন । 

    তিনি উত্তর প্রদেশ ও নেপালেরও বিরাট অংশ দখল করে নেন। এর ফলে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ১৫৫৩ সালে তিনি বাংলা আক্রমণ করেন। ইলিয়াস শাহ বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চল দুটো হারিয়ে ফেলেন কিন্তু তিনি বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হন।

    ইলিয়াস শাহের পরে সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে আসীন হন। ইতঃপূর্বে ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা অক্রমণ করে বাংলা প্রদেশটি দখল করতে ব্যর্থ হন। ফলে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনি পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। সুদীর্ঘ দুই বৎসর ফিরোজ শাহ বাংলা অবরোধ করে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিকান্দার শাহের হাতে পরাজিত হন। 

    সিকান্দার শাহ সাহিত্য ও স্থাপত্যের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার সময়ে বিশেষ করে স্থাপত্য ও ইমারত শিল্প ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। তার অমর কীর্তি হচ্ছে বিখ্যাত আদিনা মসজিদ নির্মাণ করা। এই মসজিদটি তৎকালীন ভারতবর্ষের বৃহত্তম মসজিদ (দিল্লীর চেয়েও বৃহৎ) ছিল।

    সিকান্দার শাহের পর আজম শাহ সিংহাসনে আসীন হন। তার শাসনকাল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং এ সময় তেমন যুদ্ধ বিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি। তার সময়ে চীনের রাষ্ট্রদূত মা হুয়ান বাংলাদেশে আগমণ করেন। তিনি ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজকে বাংলায় আগমনের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি রওয়ানাও হয়েছিলেন কিন্তু পথিমধ্যে মারা যান। 

    ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ বাংলার হিন্দুদের ক্ষমতায়িত করতে চেয়েছিলেন। বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়। এবং হিন্দুদের বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্তপ্রভু হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এতে হিন্দুরা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখল করে বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের অবসান ঘটান।

    গণেশীয় রাজবংশ

    গণেশীয় রাজবংশঃ রাজা গণেশ প্রাথমিক জীবনে দিনাজপুরের ভাতুরিয়া অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। তিনি বাংলার এক আমির বায়েজীদ শাহকে ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করেন। পরে বায়েজীদ শাহকে সরিয়ে তিনি নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। 

    গণেশ বাংলাদেশে সত্যপীর নামক এক নতুন পূজার উদ্ভাবন করেন। সত্যপীর একইসঙ্গে মুসলিম পীর ও হিন্দু দেবতার প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গণেশের পূর্বে বাংলার হিন্দুগণ মুসলমান শাসকদের প্রভাবে ব্যাপক মাত্রায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিলেন। এই ধর্মান্তর রোধ করার জন্য তিনি এই নতুন সত্যপীর প্রথার প্রচলন করেন।

    রাজা গণেশ নিজ পুত্র জিতেন্দ্রদেবের পরিবর্তে মহেন্দ্রদেবকে পরবর্তী রাজা হিসেবে নিয়োগ করেন। এতে জিতেন্দ্রদেব অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম আমিরদের সহায়তায়, জালালউদ্দীন মুহাম্মাদ শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মুহাম্মাদ শাহ একজন বিখ্যাত বিজেতা ছিলেন। 

    তিনি পার্শ্ববর্তী জাউনপুর রাজ্য আক্রমণ করেন। এবং তাদের কাছ থেকে বিহার প্রদেশটি ছিনিয়ে নেন। মুহাম্মাদ শাহের সময় আরাকান রাজ মেং তি মুন বার্মার হাত থেকে রক্ষার জন্য মুহাম্মাদ শাহের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং মুহাম্মাদ শাহ তাকে উদ্ধার করেন। এরপর থেকে আরাকান বাংলার একটি সামন্ত রাজ্যে পরিণত হয়।[

    মুহাম্মাদ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও উত্তরাধিকারী আহমাদ শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। তার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মতামত বিভ্রান্তিকর। ফেরেশতার মতে, তিনি তার মহান পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন এবং ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ প্রাণপণে রক্ষা করেন। অপরপক্ষে গোলাম হোসেন বলেন, তিনি অত্যাচারী ও রক্তপিপাসু ছিলেন। 

    তিনি বিনা কারণে রক্তপাত করতেন এবং অসহায় নারী-পুরুষদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতেন। যাই হোক তিনি জাউনপুরের কাছে পরাজিত হন। এবং বিহার প্রদেশটি হারিয়ে ফেলেন। সাদী খান ও নাসির খান নামক দুইজন ক্রীতদাস, যারা তার অমাত্য পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাকে হত্যা করেন এবং বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

    পরবর্তী ইলিয়াস শাহী রাজবংশ

    সাদী খান ও নাসির খান নামক ক্ষমতা দখলকারী আমীরদের সরিয়ে মাহমুদ শাহ নামক ইলিয়াস শাহী বংশের একজন বংশধর বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। এর ফলে বাংলায় ইলিয়াস শাহী রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান মাহমুদ শাহের সময় বাংলার ইমারত ও স্থাপত্য শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের ইমারত নির্মাণ করে একে সুসজ্জিত করেন। 

    এসব ইমারতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, ঢাকার বিনত বিবির মসজিদ, গৌড়ের বাইশগজী প্রাচীর প্রভৃতি। এজন্য অনেক ঐতিহাসিক তার যুগকে অগাস্টান যুগ বলে অভিহিত করে থাকেন।

    মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। বরবক শাহ জাউনপুরকে পরাজিত করে বিহার দখল করে নেন এবং কেদার রায় নামক তার একজন হিন্দু সেনাপতিকে এই অঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করেন। বরবক শাহের একজন সেনাপতি ইসমাইল গাজী আসামের রাজাকে পরাজিত করে কামরূপ (পশ্চিম আসাম) দখল করে নেন। 

    বরবক শাহের শাসনামলে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক হাবশী ক্রীতদাসের আগমন ঘটে। বরবক শাহ এদের অনেককে সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদে নিয়োগ করেন। এই হাবশীরা পরে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাড়ায়।

    সুলতান ইউসুফ শাহ একজন দানশীল, ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক শাসক ছিলেন। তিনি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি দরবারে জ্ঞানী-গুণী, আলেম ও বিচারকদের আহ্বান করতেন। পরবর্তী সুলতান ফতেহ শাহও একজন দয়ালু, কর্মঠ ও ক্ষমতাশালী সম্রাট ছিলেন। তিনি সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে রাজ্য শাসন করতেন। 

    তার সময়ে হাবশী ক্রীতদাসগণ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি এই হাবশী সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দিতে উদ্যত হন। ফলে হাবশী সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করে এবং তাকে হত্যা করে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। এর ফলে বংলার ইলিয়াস শাহী রাজবংশের পতন ঘটে।

    হোসেন শাহী রাজবংশ

    হোসেন শাহী রাজবংশঃ সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ জোরদখলকারী হাবশী শাসকদের সরিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে আরব দেশের ইয়েমেন থেকে বাংলাদেশে আগত এক উদ্বাস্তু ছিলেন। হোসেন শাহ বাংলার সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহ যেমন কামরূপ (পশ্চিম আসাম), ত্রিহুত (উত্তর বিহার) ও চট্টগ্রাম (আরাকানের হাত থেকে) জয় করেন। 

    তবে তিনি দক্ষিণ বিহার জয় করতে ব্যর্থ হন কারণ দিল্লীর সম্রাট সিকান্দার লোদী তার পূর্বেই উক্ত অঞ্চল দখল করে নেন। হোসেন শাহের শাসন আমলে সাহিত্য ও স্থাপত্য কলার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি ছিলেন হিন্দু মুসলিম সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক। অনেক ঐতিহাসিক তার যুগকে বাংলার স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

    হোসেন শাহের পর তার পুত্র নুসরাত শাহ বাংলার সিংহাসনে আসীন হন। পিতার মত তিনিও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পিতার আমলে সাহিত্যকলা ও স্থাপত্য শিল্পের যে বিকাশ ঘটে তা তার সময়ও অব্যাহত থাকে। নসরত শাহের সময় ভারতবর্ষে আফগান শাসনের অবসান হয় ও মুঘল শাসনের পত্তন ঘটে। বিপুল সংখ্যক আফগান আমীর পলায়ন করে বাংলাদেশে আসেন। 

    নসরত শাহ সম্রাট মাহমুদ লোদী ও জালাল খানের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য অগ্রসর হন। কিন্তু ঘাগরার যুদ্ধে মিত্রবাহিনী পরাজিত হয়। নসরত শাহ বাবরের সাথে একটি সন্ধিচুক্তি করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন।

    নসরত শাহের পর তার পুত্র ফিরোজ শাহ বাংলার সিংহাসনে আসীন হন। কিন্তু তার খুল্লতাত মাহমুদ শাহ তাকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেন। এর ফলে রাজপরিবারে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ত্রিহুতের শাসনকর্তা মখদুম আলম স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন। কিন্তু মাহমুদ শাহ তাকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। 

    এসময় বিহারের শাসনকর্তা জালাল খান তার অভিভাবক শের খানের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মাহমুদ শাহকে বিহার আক্রমণের জন্য আহ্বান জানান। মাহমুদ শাহ বিহার আক্রমণ করেন কিন্তু তিনি পরাজিত হন। অতঃপর ১৫৩৮ সালে শেরশাহ বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে নেন। ফলে বাংলার হোসেন শাহী রাজবংশের পতন ঘটে।

    পাখতুন শাসন

    পাখতুন শাসনঃ পাখতুনগণ ছিলেন আফগানিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তু এবং তারা পাঠান নামেও পরিচিত ছিলেন। পাখতুনগণ ছিলেন ভারতবর্ষের অধিশ্বর এবং তারা ভারতে লোদী বংশ নামে একটি শক্তিধর রাজবংশ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে পানিপথের যুদ্ধে মুঘলদের হাতে তাদের পরাজয় হয় এবং তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

    সূরী রাজবংশ

    সূরী রাজবংশঃ সূরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সূরী প্রাথমিক জীবনে বিহারের সাসারাম অঞ্চলের এক ক্ষুদ্র জায়গীরদার ছিলেন। পরে নিজ প্রতিভাবলে তিনি বিহারের শাসনকর্তা বিহার খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন এবং বিহারের উপ প্রশাসকের পদে নিযুক্ত হন। ১৫৩৬ সালে শের শাহ বাংলার শাসনকর্তা মাহমুদ শাহের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে মাহমুদ শাহ কিউল থেকে সিকরিগলি পর্যন্ত অঞ্চলটি শের শাহকে সমর্পণ করেন। 

    ১৫৩৭ সালে শের শাহ দ্বিতীয়বার বাংলা আক্রমণ করেন এবং এবার সম্রাট মাহমুদ শাহকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে বাংলা দখল করেন। শের শাহ নিজেকে বাংলার সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ফরিদউদ্দীন শের শাহ উপাধি ধারণ করেন।

    শেরশাহ বাংলা ও বিহারের বিরাট ভূখণ্ডের অধিকারী হয়ে বসলে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন চুনার দখল করে বাংলা আক্রমণ করেন। সুচতুর শেরশাহ সম্মুখ সমরে লিপ্ত না হয়ে বাংলাদেশ পরিত্যাগ করেন এবং পরোক্ষভাবে বারানসী, রোটাস ও জাউনপুর দখল করে কনৌজের দিকে অগ্রসর হন। হুমায়ুন আগ্রার পথে যাত্রা করলে বক্সারের নিকট চৌসা নামক স্থানে শের শাহ তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। 

    ১৫৪০ সালের ১৭ই মে কনৌজ এর বিলগ্রামের যুদ্ধে শের শাহ হুমায়ুনকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সূরী বংশের সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। শের শাহ হচ্ছেন বাংলার একমাত্র মুসলিম সম্রাট যিনি উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

    শেরশাহের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের সেনাধ্যক্ষগণ জ্যেষ্ঠ্যপুত্র আদিল খানের পরিবর্তে ইসলাম শাহকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন, কারণ ইসলাম শাহ রাজপুত্র অবস্থায় অধিকতর সামরিক প্রতিভা প্রদর্শন করেছিলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আদিল খান ইসলাম শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আদিল খান তার বাহিনী নিয়ে আগ্রার দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু ইসলাম শাহের হাতে পরাজিত হন। 

    ইসলাম শাহের সময় মুঘল সম্রাট হুমায়ুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য তার নিকট প্রার্থনা জানান। কিন্তু তিনি এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ইসলাম শাহের শাসনকাল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এ সময় তেমন কোন যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা ঘটেনি।

    ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর সূরী সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হয়। ইসলাম শাহের পর তার পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি আদিল শাহ সূরী (এই আদিল শাহ পূর্ববর্তী আদিল শাহ হতে পৃথক) কর্তৃক পদচ্যূত হন। 

    অদিল শাহ পরবর্তীতে ইব্রাহীম শাহ সূরী নামক সূরী বংশীয় অপর একজন দাবীদারের কছে পরাজিত হন এবং তিনি দিল্লী ও আগ্রা দখল করে বসেন। ইব্রাহীম শাহ অবার সিকান্দার শাহ সূরী কর্তৃক পরাজিত হন এবং সিকান্দার শাহ নিজেকে ভারতবর্ষের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে সূরী সাম্রাজ্য বিপর্যস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়।

    কররানী রাজবংশ

    কররানী রাজবংশঃ ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তাজ খান কররানী বাংলার দুর্বল সুলতান গিয়াসউদ্দীনকে পরাজিত করে সিংহাসন দখল করেন। তাজ খান দিল্লীর সূরী বংশীয় সম্রাট ইসলাম শাহের একজন বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন। কিন্তু তার পরে আদিল শাহ অনৈতিকভাবে সিংহাসন দখল করলে তাজ খান বাংলায় পলায়ন করেন এবং এখান থেকেই তিনি আদিল শাহের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। 

    এখানে তিনি বাহাদুর শাহের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বে আদিল শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন। তাজ খান বাংলার মাটিতে তার ক্ষমতার বীজ শক্তভাবে প্রোথিত করেন। পরবর্তীতে সুলতান গিয়াসউদ্দীনকে পরাজিত করে তিনি বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

    তাজ খানের পর তার ভাই সুলায়মান খান কররানী বাংলার মসনদে অসীন হন। দিল্লীতে হুমায়ুন কর্তৃক মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবার পর দলে দলে আফগান অভিবাসীগণ বাংলায় এসে বসবাস শুরু করে। ফলে সুলায়মানের আধিপত্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুলায়মানের সাথে উড়িষ্যার সম্রাট মুকুন্দ হরিচন্দনের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। 

    বিরোধের কারণ বাংলার সিংহাসনের অন্যতম দাবীদার ইব্রাহীম সূরীকে আশ্রয় প্রদান করা। ১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলায়মান তার পুত্র বায়েজীদ খান ও সেনাপতি কালাপাহাড়কে এক বিশাল সেনাবাহিনী সহ উড়িষ্যায় প্রেরণ করেন। রাজা হরিচন্দন মুসলিম বাহিনীর নিকট পরাজয় বরণ করেন। পুরীসহ সমস্ত উড়িষ্যা কররানী রাজ্যের অধীনস্ত হয়।

    সুলতান দাউদ খান কররানী সুলায়মান খান অপেক্ষা অধিকতর স্বাধীনচেতা ও আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। মুঘল সম্রাট আকবর সেনাপতি মুনিম খানকে বাংলা আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু মুঘল সেনাপতি পরাজিত হন। 

    ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর স্বয়ং পাটনা অবরোধ করেন। ফলে দাউদ খান পরাজিত হন। ১৫৭৬ সালে মুঘল ও বাঙ্গালী সেনাবাহিনী রাজমহলের প্রান্তরে একটি চূড়ান্ত যদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের প্রথমদিকে বাঙ্গালী বাহিনী বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীতে সেনাপতি কতলু খান ও বিক্রমাদিত্য বিশ্বাসঘাতকতা করলে তারা পরাজিত হয়। ফলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যাসহ সমগ্র পূর্ব ভারত মুঘল সাম্রাজ্যের পদানত হয়।

    মুঘল যুগ

    এংগাস মেডিসনের হিসাব অনুযায়ী অর্থনীতির দিক দিয়ে প্রধান অঞ্চলগুলোর ১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের জিডিপি এর ক্ষেত্রে অবদান। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত জিডিপির ক্ষেত্রে ভারত ছিল এক বৃহত্তম অর্থনীতি, যার অর্ধেক মান মুঘল বাংলা থেকে এসেছিলো।

    বাংলার পশ্চিমাংশ ও উত্তরাংশ ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের সময় মুঘল সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। আফগান কররানী বংশের শাসক দাউদ কররানীকে হত্যার মাধ্যমে মুঘল শাসনের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু বারো ভূঁইয়াদের পরাজয়ের মাধ্যমে প্রকৃত মুঘল আধিপত্য আরম্ভ হয়। 

    বাংলার বিভিন্ন সুবাদারগণ বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হন। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুবাদার ছিলেন ইসলাম খান, মীর জুমলা, শায়েস্তা খান প্রমুখ।

    ইসলাম খান

    মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ১৬০৮ সালে ইসলাম খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে বাংলার শাসন কাজ পরিচালনা করতেন, যার নামকরণ করা হয়েছিল জাহাঙ্গীর নগর। বিদ্রোহী রাজা, বারো-ভূঁইয়া, জমিদার ও আফগান নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার প্রধান কাজ। 

    তিনি বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খানের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং ১৬১১ সালের শেষের দিকে মুসা খান পরাজিত হন। ইসলাম খান যশোরের প্রতাপাদিত্য, বাকলার রামচন্দ্র এবং ভুলুয়া রাজ্যের অনন্ত মানিক্যকে পরাজিত করেছিলেন। এরপর তিনি কোচবিহার, কোচ হাজো এবং কাছাড় রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, এইভাবে চট্টগ্রাম ব্যতীত সমগ্র বাংলায় আধিপত্য স্থাপন করেছিলেন।

    মীর জুমলা

    মীর জুমলা বাংলার একজন বিখ্যাত সুবাদার ছিলেন। তিনি প্রাথমিক জীবনে গোলকুণ্ডায় একজন হীরক ব্যবসায়ী হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন। এ সময়ই তিনি কোহীনুর নামে বিখ্যাত হীরক খণ্ডের অধিকারী হন। এ হীরক খণ্ডটি পরে তিনি সম্রাট শাহজাহানকে উপহার দেন। তার সময়ে কোচবিহার (পশ্চিম আসাম) ও আসামে (পূর্ব আসাম) মুঘল অভিযান প্রেরিত হয়। 

    গহীন জঙ্গল পার হয়ে কোচবিহারে মুঘল বাহিনী প্রবেশ করলে প্রাণভয়ে রাজা প্রাণনাথ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। কোচবিহার দখলের পর মীর জুমলা আসামে অভিযান পরিচালিত করেন। মুঘল বাহিনী অনায়াসে কামতা, গোয়ালপাড়া, গোহাটী প্রভৃতি সীমান্তবর্তী শহর দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত যুদ্ধে রাজধানী ঝাড়গাও দখলকৃত হয় এবং রাজা জয়ধ্বজ নারায়ণ আত্মসমর্পণ করেন।

    শায়েস্তা খান

    ১৬৬৩ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাংলার দীর্ঘতম গভর্নর ছিলেন। তার সময়ে বাংলার সুখ ও শান্তি চরমে ওঠে। কথিত রয়েছে তার সময় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। শায়েস্তা খানের বিখ্যাত কীর্তি আরাকানের জলদস্যুদের হাত থেকে চট্টগ্রামের পুনর্দখল করা। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খান নিজ পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানকে অধিনায়ক মনোনীত করে আরাকানে সৈন্য প্রেরণ করেন। 

    ১৬৬৬ সালের ২৩ ও ২৪ জানুয়ারী সংঘটিত কাঠালিয়ার যুদ্ধে মগ বাহিনী সম্পূর্ণ রূপে বিধ্বস্ত হয়। পরে তারা কর্ণফুলী নদীতে প্রতিরোধ গড়ে তুললে মুঘল নৌবহরের কামানের সামনে পরাস্ত হয়। চট্টগ্রামে পুনরায় মুঘল আধিপত্য স্থাপিত হয়।[৩৮] শায়েস্তা খান এর নতুন নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। চট্টগ্রাম দখল করে মগদের হাতে বন্দী অসংখ্য নর নারীকে মুক্তি দেওয়া হয়।

    বাংলার নবাব

    মুর্শিদকুলী খান ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর সুবাহ বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি রাজধানী মাখসুদাবাদে স্থানান্তর করেন যা তার নাম থেকে মুর্শিদাবাদে নামকরণ হয়। তিনি একজন ধর্মনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাদরদী শাসক ছিলেন। তিনি ইসলামী শরীয়ত অনুসারে কঠোরভাবে দেশ শাসন করতেন। 

    তিনি সপ্তাহে দুবার স্বয়ং বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তার সময়ে দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাংলা তুর্কী, পারসী, মাজাপাহী, ইংরেজ, ফরাসী প্রভৃতি জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।[৩৯] তার সময়ে বাংলার হুগলী একটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বন্দরে পরিণত হয়।

    মুর্শিদকুলী খানের পর তার জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলার নবাব হন। তিনি ত্রিপুরা আক্রমণ করেন এবং ত্রিপুরা বাংলার একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। তিনি বীরভূমের শাসক বদিউজ্জামানের বিদ্রোহ দমন করেন। 

    তিনি কঠোরভাবে ইউরোপীয় বণিকদের দস্তক প্রথা ও শুল্ক ফাঁকি বন্ধ করেন। তার সময়ে ইংরেজ, ফরাসি ও পর্তুগিজ বণিকগণ কোনরূপ শুল্ক ফাঁকি দিতে পারতেন না। উপরন্তু নবাবকে ইউরোপীয় বণিকদের নজরানা দিয়ে সবসময় সন্তুষ্ট রাখতে হত। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ নবাবকে তুষ্ট করার জন্য তিন লক্ষ টাকা নজরানা দেন।

    নবাব আলীবর্দী খানের সময় বাংলায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তার সময়ে মারাঠাগণ বাংলা আক্রমণ করে। তবে আলীবর্দী খান একজন বিখ্যাত মহাবীর ছিলেন। তিনি সুদীর্ঘ দশ বছর মারাঠাদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত থাকেন। 

    এবং বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হন। তবে তিনি উড়িষ্যা প্রদেশটি মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।[৪১] নবাব আলীবর্দী খানের পরে সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার নবাব হন। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। প্রথমদিকে কলকাতার যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করলেও শেষ পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হন। ফলে বাংলার নবাবী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

    ঔপনিবেশিক শাসন

    বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে (Baxter  , pp. 23–28)। ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। 

    ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন। (Baxter, pp. 30–32) ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রীস্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।

    ১৯০৫ হতে ১৯১১ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়। (Baxter, pp. 39–40) তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায় ১৯১১ সালে। 

    ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে আবার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়, আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের নাম পাল্‌টে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়। [৪৪]

    পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১)

    ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা ভারত ও পাকিস্তান। মুসলিম আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বাংলা নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। পূর্ব পাস্তিানের ইতিহাস মূলত: পশ্চিম পাকিস্তানীদ শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সামরিক শাসন।

    ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ভূমি সংস্কারের অধীনে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়।(Baxter, p. 72) কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। 

    ১৯৫২ খ্রীস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়। (Baxterউদ্ধৃতি ত্রুটি: শুরুর <ref> ট্যাগ সঠিক নয় বা ভুল নামে রয়েছে, pp. 62–63) পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।

    পাকিস্তানী প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল বা 'কপ'-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দলোনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে।

    স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস 

    ভাষা আন্দোলনঃ ছিল পূর্ব বাংলার ইতিহাসে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন যার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়। পাকিস্তানের সরকারী কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এ আন্দোলন পরিচালিত হয়। মুফতি নাদিমুল কামার আহমেদ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন।

    ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের বিভাজনের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সংগঠিত হয়; তার দুটি অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান এর মধ্যে ব্যাপক সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক এবং ভাষাগত পার্থক্য বজায় ছিল। এ পার্থক্য পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে।

    ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রের একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে ঘোষণা করে, এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নতুন আইন প্রনয়ণের সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং গণ বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে, সরকার সকল ধরনের গণ সমাবেশ ও প্রতিবাদ আন্দোলন বেআইনি ঘোষণা করে। 

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীরা এই আইন অমান্য করে এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে একটি বিরাট আন্দোলন সংগঠিত করে। ঐদিনে বহু ছাত্র বিক্ষোভকারীদের পুলিশ হত্যা করে এবং এই আন্দোলন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

    এই হত্যাকাণ্ডের পরে সারা দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ যার পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ। কয়েক বৎসর ব্যাপী সংঘর্ষ চলার পর, কেন্দ্রীয় সরকার অবশেষে পরাজয় স্বীকার করে এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর, ইউনেস্কো, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস, একটি জাতীয় দিবস হিসাবে পরিগণিত হয়। শহীদ মিনার স্মৃতিস্তম্ভটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আন্দোলন ও তার শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়।

    রাজনীতিঃ ১৯৫৪-১৯৭০

    পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ধীরে ধীরে বিরাট পার্থক্য গড়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি সংখ্যালঘু অংশ ছিল, কিন্তু রাজস্ব বরাদ্দ, শিল্প উন্নয়ন, কৃষি সংস্কার ও নাগরিক প্রকল্পসমূহের বৃহত্তম অংশের ভাগীদার ছিল তারাই । পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক পরিষেবাগুলো মূলত পাঞ্জাবি জাতি দ্বারা অধিকৃত ছিলপাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে শুধুমাত্র একটি রেজিমেন্ট ছিল বাঙ্গালীদের। 

    অনেক বাঙ্গালী পাকিস্তানীদের কাশ্মীর ইস্যুতে স্বভাবজাত উৎসাহ বোধ করেনি , কারণ তারা মনে করত এটি পূর্ব পাকিস্তানকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলবে এবং এটি শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেবে।

    ১৯৬৮ সালের গোড়ার দিকে শেখ মুজিব ও অন্যান্য ৩৪ জন নেতার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ভারতবর্ষের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করছিল। যাইহোক এই বিচারের ফলে একটি গণ আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং সকল বন্দীদের মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। 

    ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে একজন বিদ্রোহী, জহুরুল হককে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয় এবং পরবর্তীতে ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। গণআন্দোলন পরবর্তীকালে '৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে রূপ লাভ করে।

    ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ আইয়ুব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খান কে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পরবর্তীকালে নতুন রাষ্ট্রপতি দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড স্থগিত করে দেন। যাইহোক কিছু সংখ্যক ছাত্র গোপনীয়তার সাথে আন্দোলন বজায় রাখে। সিরাজুল আলম খান এবং কাজী আরেফ আহমেদের নেতৃত্বাধীন '১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনী' নামে একটি নতুন দল গঠন করা হয়। 

    পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে, ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৫ই অক্টোবরের জন্য একটি নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।পশ্চিমের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত করে।

    স্বাধীনতার প্রস্তুতি-

    আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বেশিরভাগ অংশে ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং পাকিস্তান সরকার সাংবিধানিক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাথে আলোচনা শুরু করে। কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রদেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন হয়, সেইসাথে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হয়। 

    তবে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ পাকিস্তানী রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন, যা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা করে। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের এক ছাত্র নেতা আ স ম আবদুর রবের নির্দেশে বাংলাদেশের নতুন (জাতীয় পতাকা উত্থাপিত হয়।

    আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা দাবী করে যে শেখ মুজিবুর রহমান অবিলম্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করুন, কিন্তু মুজিবুর রহমান এই দাবীতে সম্মত হতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। বরং তিনি ৭ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য একটি জনসভায় তার পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 

    ৩রা মার্চ ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের নির্দেশে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সামনে স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করেন। ৭ মার্চ তারিখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি জনসাধারণের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর চলমান স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রসরতা সম্পর্কে জন সাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।

    আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পরবর্তীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৭ই মার্চ এর ভাষণে, পাকিস্তানী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি আসন্ন যুদ্ধের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে প্রস্তুত থাকার জন্য আহ্বান জানান। যদিও তিনি সরাসরি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেননি, কারণ তখনও আলোচনা চলছিল, তিনি তার শ্রোতাদেরকে কোনও এক সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত থাকার জন্য আহ্বান জানান। 

    শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়, এবং এ ভাষণের বিখ্যাত উক্তি ছিল:

    এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।

    স্বাধীনতার যুদ্ধ

    ২৬ মার্চের প্রথমার্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সামরিক অভিযান শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং রাজনৈতিক নেতারা বহুবিভক্ত হয়ে যান। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার আগে, শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বাক্ষরিত নোট প্রেরণ করেন যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। 

    এই নোটটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এর বেতার ট্রান্সমিটার দ্বারা প্রচারিত হয়। বাংলাদেশী আর্মি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট রেডিও স্টেশন দখল করেন এবং ২৭ মার্চ সন্ধ্যার দিকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। 

    সামরিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে ১১ জন কমান্ডারের অধীনে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এই আঞ্চলিক বাহিনীগুলোর সাথে সাথে যুদ্ধের জন্য আরও তিনটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়ঃ জেড ফোর্স, এস ফোর্স এবং কে ফোর্স। এই তিনটি বাহিনীর নাম উক্ত বাহিনীর কমান্ডারদের নামের প্রথম অক্ষর থেকে উদ্ভূত হয়েছে। মেহেরপুর সরকার কর্তৃক প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ বেশিরভাগ অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল, 

    যা ভারত কর্তৃক সমর্থিত ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলার মুক্তি বাহিনী এর মধ্যে যুদ্ধের সময় আনুমানিক এক কোটি বাঙালী, প্রধানত হিন্দু, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় নেয়। ভারত বাংলাদেশকে নানাভাবে সাহায্য করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের অবদান অপরিসীম।

    পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ভারতের সহানুভূতি ছিল এবং ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশীদের পক্ষে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সংক্ষিপ্ত এবং ব্যাপক বিধ্বংসী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজী এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষগণ ভারত ও বাংলাদেশের মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। 

    আত্মসমর্পণকালে শুধুমাত্র কয়েকটি দেশ নতুন রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯০ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করে।

    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশর ইতিহাস

    অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সরকার। এই সরকার দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা জারি করে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সংবিধান প্রণয়ন করে এবং মৌলিক নীতিমালা হিসাবে সমতা, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ এবং সামরিক সর্বাধিনায়ক ছিলেন এম এ জি ওসমানী। 

    অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মুহাম্মদ মনসুর আলী। নবনির্মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এর সদস্যগণ এবং পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসের স্বপক্ষত্যাগী সদস্যদের সমন্বয়ে এই সরকার গঠিত হয়। এই সরকারে আবু সাঈদ চৌধুরী, হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এবং রেহমান সোবহান এর নেতৃত্বে এটি একটি সুদক্ষ কূটনৈতিক সংগঠনও ছিল। 

    বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এগারোটি সেক্টর কমান্ডারের মধ্যে বিভক্ত ছিল; যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশারফ,কে.এম. শফিউল্লাহ প্রমুখ।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ভারত আন্তরিকভাবে সকল ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রদান করে। নির্বাসিত এই সরকারের রাজধানী ছিল কলকাতা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত চূড়ান্ত যুদ্ধের দুই সপ্তাহের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে পাক সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করে।

    শেখ মুজিব প্রশাসনের ইতিহাস

     বামপন্থী দল আওয়ামী লীগ যারা ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জিতেছিল, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর প্রথম সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১লা জানুয়ারী বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধাণমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন এবং ব্যাপকভাবে দেশটির স্বাধীনতার নায়ক এবং জাতির পিতা হিসেবে গণ্য হন। 

    তার শাসনামলে বাঙালী জাতীয়তার গঠন ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে। ১৯৭২ সালে কামাল হোসেন এর রচিত সংবিধানটি মূলত একটি উদার গণতান্ত্রিক সংসদীয় প্রজাতন্ত্র গঠন করে, যার ওপর সমাজতন্ত্রের কিছুটা প্রভাব ছিল।

    আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, মুজিব এবং ভারতীয় প্রধাণমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৫-বছর মেয়াদী ইন্দো-বাংলাদেশী বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তির স্বাক্ষর করেন। আমেরিকান ও সোভিয়েত নেতাদের সাথে আলোচনা করার জন্য ওয়াশিংটন ডিসি ও মস্কোতে মুজিবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের দিল্লী চুক্তিতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তির জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করে।

    এই চুক্তিটি পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালী কর্মকর্তাদের এবং তাদের পরিবারদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। তার পাশাপাশি ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথ প্রশস্ত করে।

    স্থানীয়ভাবে, মুজিবের শাসনামলে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান হয়ে ওঠে। প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর একটি বিদ্রোহ ছিল, পাশাপাশি বাণিজ্যগোষ্ঠী এবং রক্ষণশীল শক্তিবর্গের একটি আন্দোলন ছিল, যারা মনে করত আওয়ামী লীগ সমগ্র মুক্তি আন্দোলনের মুনাফা একচেটিয়াভাবে গ্রহণ করে। 

    বিক্ষোভ দমনের জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে তিন মাসের জরুরী অবস্থা জারি করেন। তিনি জাতীয় রক্ষী বাহিনী গঠন করেন, যা মানবাধিকার অপব্যবহারের ব্যাপারে অভিযুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেকেও জাতীয় রক্ষী বাহিনী দ্বারা অসন্তুষ্ট হয়েছিল।

    সামরিক অভ্যুত্থান ও প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন

    জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি এবং সিএমএলএ এর পদ গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে জিয়া তার রাষ্ট্রপতিত্ব ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে গণতান্ত্রিক রূপ প্রদানের জন্য একটি রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। 

    দেশীয় মুসলিম ঐতিহ্যের উপর জোর দিয়ে জিয়া একটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণার প্রথাকে তুলে ধরেন। ১৯৭৯ সালে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি ভূমিধ্বসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পরিণত হয়।

    রাষ্ট্রপতি জিয়া সংবিধানে মুক্ত বাজার অর্থনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন, সমাজতন্ত্রকে "অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার" হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেন এবং একটি বৈদেশিক নীতিমালা প্রণয়ন করেন যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার সাথে সহযোগিতার ওপর জোর প্রদান করে। 

    প্রেসিডেন্ট জিয়ার অধীনে দেশে দ্রুত অর্থনীতি ও শিল্পায়নের উদ্যোগ বৃদ্ধি পায়। সরকার দেশের প্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গুলো তৈরি করে, একটি জনপ্রিয় খাদ্য-কর্মসূচী পরিচালনা করে, খামারগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় এবং বেসরকারী খাতের উন্নয়নকে উৎসাহিত করা হয়।

    জিয়া তার সরকারের বিরুদ্ধে একুশটি অভ্যুত্থানের মোকাবিলা করেছিলেন, যার মধ্যে একটি ছিল বিমানবাহিনী দ্বারা। তার এক সময়কার সহকারী কর্নেল আবু তাহেরকে দেশদ্রোহের চেষ্টায় গ্রেফতার করা হয় এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীতে তার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অনেকেরই এই রকম পরিণতি দেখা যায়। 

    তবে চূড়ান্ত অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টায় ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ঘটে। মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর -এর প্রতি বিশ্বস্ত সৈন্যদের হাতে জিয়া নিহত হন, যখন ১৯৮১ সালের ৩০ মে তারা চট্টগ্রামে তার সরকারী বাসভবনে হানা দেন। সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এই বিদ্রোহকে দমন করেন।

    সাত্তার প্রশাসন

    জিয়াউর রহমানের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার। আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত হন, যদিও তার প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল হোসেন তাকে কারচুপির জন্য অভিযুক্ত করেন। ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের কারণে সাত্তারের প্রেসিডেন্সী মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাসন করে ও উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা নূরুল হুদা।

    উত্তরপূর্ব ভারতে বিদ্রোহ এবং বার্মায় মুসলিম সহিংসতাগুলোর প্রেক্ষাপটে একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা হয়। আবদুস সাত্তার বয়স্কতার কারণে স্বাস্থ্য সমস্যার ভোগেন। ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান রাষ্ট্রপতি সাত্তার এবং তার বেসামরিক সরকারকে বহিষ্কার করে। বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থানের পিছনে কারণ হিসাবে খাদ্য সংকট, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

    দ্বিতীয় সামরিক আইন এবং এরশাদ প্রশাসন

    সাত্তারকে প্রধান বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী পদচ্যুত করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন ঘোষণা করেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। তিনি মন্ত্রিপরিষদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ডেপুটি মার্শাল ল' অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসাবে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রধানদের নিয়োগ করেন। 

    এরশাদের মার্শাল ল' শাসনের অধীনে রাজনৈতিক নিপীড়ন ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। যাইহোক, সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি সুসংঘবদ্ধ কাঠামো প্রণয়ন করে। দেশের আঠারো জেলাকে ৬০ টি জেলায় বিভক্ত করা হয়। দেশে উপজেলা ব্যবস্থাও প্রবর্তন করা হয়।

    এরশাদ সোভিয়েত বিরোধী জোটের পক্ষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আরও জোরদার করেন। ১৯৮৩ সালে এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তার প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতি (৭০% পর্যন্ত শিল্প রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছিল) এবং হালকা উৎপাদন, কাঁচামাল এবং সংবাদপত্র সহ ভারী শিল্পে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। 

    বিদেশী কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের শিল্পে বিনিয়োগ করতে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং উৎপাদন রক্ষা করার জন্য কঠোর ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন জারি করা হয় এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়।

    এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন এবং ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। সব প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এবং দাবী করে যে সরকার স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে অসমর্থ হয়েছে। ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টি ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৫১ টি আসন লাভ করে। 

    ১৯৮৮ সালের জুন মাসে সংসদ সহস্রাধিক বিল পাস করে, একটি বিতর্কিত সংশোধনীতে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম এবং ঢাকার বাইরের শহরগুলিতে উচ্চ আদালতের বেঞ্চ গঠন করতে বিধান জারি হয়। যদিও ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে বজায় থাকে, তবে ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের বিধান সুপ্রীম কোর্টের রায় কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। 

    গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও বর্তমান যুগ

    এরশাদ সামরিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন সমগ্র দেশকে আচ্ছাদিত করে এবং এতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত উভয় শ্রেণীর জনগণ অংশগ্রহণ করে। প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন এবং দেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। শাহাবুদ্দিন এরশাদকে গ্রেফতার করেন এবং ১৯৯১ সালে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হন।

    খালেদা প্রশাসন (১৯৯১-১৯৯৬) ইতিহাস

    মধ্য ডানপন্থী দল বিএনপি বহুসংখ্যক আসনে জয়লাভ করে এবং ইসলামী দল জামায়াত-ই-ইসলামির সমর্থনে সরকার গঠন করে, জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। জাতীয় পার্টি-এর প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে বন্দী ছিলেন। 

    খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সংবিধানে আরও বেশি পরিবর্তন এনে সাংসদরা সম্মিলিতভাবে একটি সংসদীয় পদ্ধতি পুনর্নির্মাণ করেন এবং বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের মৌলিক সংবিধান অনুযায়ী আবার প্রধানমন্ত্রী শাসিত শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসে।

    অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান একটি উদার অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা শুরু করেন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় একটি মডেল হিসেবে দেখা হয়। মার্চ ১৯৯৪ সালে একটি সংসদীয় উপনির্বাচনে বিতর্ক দেখা দেয়, যাতে বিরোধী দল দাবী করে যে সরকার অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় এসেছে। 

    সমগ্র বিরোধী দল অনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সংসদ বয়কট করে। বিরোধীদল এও দাবী করে যে খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগ করুক এবং তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য, বার বার সাধারণ হরতালের একটি কর্মসূচি প্রনয়ণ করে।

    কমনওয়েলথ সচিবালয়ের সহায়তায় বিতর্কের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে আরেকটি সমঝোতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সংসদ থেকে বিরোধী দল পদত্যাগ করে। তারপর সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য তারা মিছিল, বিক্ষোভ ও হরতালের প্রচারণা চালায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে বয়কটের অঙ্গীকার করে। 

    ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার পর, সংসদ একটি সংবিধান সংশোধন করে, একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণ এবং নতুন সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য অনুমতি প্রদান করে।

    দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার (১৯৯৬)

    প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান দেশের সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অভিষিক্ত হন। এই সময়ে, রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস সেনাবাহিনী প্রধান 

    লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বরখাস্ত করেন, যার ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে আকস্মিক অভ্যুত্থান দেখা দেয়। বরখাস্ত সেনা প্রধান নাসিম বগুড়া, ময়মনসিংহ ও যশোরের সৈন্যদলসহ ঢাকায় যাওয়ার জন্য তার অনুগত বাহিনীকে নির্দেশ দেন।

    তবে সাভারের সামরিক কমান্ডার দেশের রাষ্ট্রপতির পক্ষে যোগদান করেন এবং রাজধানী ও তার আশেপাশের মহাসড়কে ট্যাংক মোতায়েন করেন, এবং অভ্যুত্থান বাহিনীকে দমন করার জন্য অপারেশনের অংশ হিসেবে ফেরী চলাচল বন্ধ করে দেন। 

    পরে লেঃ জেনারেল নাসিমকে ঢাকা সেনানিবাসে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা সফলভাবে ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন তারিখে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। আওয়ামী লীগ সংসদে ১৪৬ টি আসনে জয়লাভ করে এবং একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিএনপি ১১৬ টি আসন এবং জাতীয় পার্টি ৩২ টি আসন লাভ করে।

    হাসিনা প্রশাসনের (১৯৯৬-২০০১) ইতিহাস

    শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের জুন মাসে "জাতীয় ঐকমত্যের সরকার" নামক একটি সরকার গঠন করেন, যার মধ্যে ছিল জাতীয় পার্টির একজন মন্ত্রী এবং জাতীয় সামাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর একজন মন্ত্রী। জাতীয় পার্টি কোনও আনুষ্ঠানিক জোটে প্রবেশ করেনি এবং পার্টির প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে লীগ সরকারের কাছ থেকে তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। 

    ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে কেবল তিনটি দলেরই ১০ জনের অধিক সদস্য নির্বাচিত হয়: এই তিনটি দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদকে ১৯৯৭ সালের জানুয়ারীতে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।

    আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীন নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৯৬ সালের জুন নির্বাচন মুক্ত এবং ন্যায্য ছিল এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপি এই নতুন সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। হাসিনা প্রশাসন পরিবেশগত ও আন্তঃজাতিগত চুক্তির ক্ষেত্রে মাইলফলক কৃতিত্ব অর্জন করে। এগুলো হল ভারতের সাথে গঙ্গার পানি ভাগ চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত বিদ্রোহীদের সাথে শান্তি চুক্তি।

    ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এক বিরল ও অভূতপূর্ব ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনের আয়োজন করেন, যাতে অংশগ্রহণ করেন-
    • পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, 
    • ভারতের প্রধানমন্ত্রী আই. কে. গুজরাল এবং 
    • আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন।
    ১৯৯৯ সালের জুন মাসে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো আবার সংসদে উপস্থিত হতে বিরত থাকে। ১৯৯৭ সালে "ছয় দিনের" হরতাল থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালে "২৭ দিনের" হরতাল পর্যন্ত; বিরোধীদলের পক্ষ থেকে ব্যাপক সংখ্যক হরতালের সৃষ্টি হয়। 

    ১৯৯৯ সালের শুরুতে গঠিত চার-দলীয় বিরোধী জোট ঘোষণা করে যে, নির্বাচনী বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারী নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে কার্যকরী পদক্ষেপ না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি এবং এর ফলে বিএনপি পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে পৌর পরিষদের নির্বাচন, বেশ কয়েকটি সংসদীয় উপনির্বাচন এবং ২০০০ সালের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জন করে।

    তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে (২০০১) ইতিহাস

    প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সহিংসতা দমনের ক্ষেত্রে সাফল্যের পরিচয় দেয়। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর তারিখে সংসদীয় সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল বিজয় দেখা দেয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল জামায়াত-ই-ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্য জোট। বিএনপি ১৯৩ টি লাভ করে এবং জামায়াত ১৭ টি আসনে জয়লাভ করে।

    খালেদা প্রশাসনের (২০০১-২০০৬) ইতিহাস

    ২০০১ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচন পরিদর্শক দলের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে ঘোষণা সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা বিগত নির্বাচনের নিন্দা করেন এবং সংসদ বর্জন করেন। ২০০২ সালে তিনি অবশ্য তার দলকে জাতীয় সংসদে নেতৃত্ব দেন, কিন্তু আওয়ামী লীগ আবার 

    ২০০৩ সালের জুন মাসে একজন রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী এবং সংসদীয় স্পিকারের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা এবং সেই সাথে অপমানজনক মন্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। জুন ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ তাদের দাবী পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও সংসদে ফিরে আসে। ২০০৫ সালের বাজেট অধিবেশনের সময় সামগ্রিক বয়কটের ঘোষণা দেবার আগে তারা অনিয়মিতভাবে সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

    খালেদা জিয়ার প্রশাসন উন্নত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সেই সাথে দুর্নীতির অভিযোগ এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও রক্ষণশীল শক্তির মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষের দ্বারা চিহ্নিত হয়। উইকিলিকস কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত আমেরিকান কূটনৈতিক মিডিয়াগুলোতে তার ছেলে তারেক রহমানকে "গোপনীয়তার জন্য বিখ্যাত এবং বারংবার সরকারি ক্রয়কর্ম ও রাজনৈতিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষের জন্য" বিখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।  

    আফগানিস্তানে তালেবানদের উৎখাত হওয়ার পর বাংলাদেশ ত্রাণ তৎপরতার ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, যার মধ্যে "ব্র্যাক" যুদ্ধবিমুখ দেশটির বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়।হাই প্রোফাইলের একটি সিরিজ গুপ্তঘাতক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় নেতাদের হত্যার হুমকি প্রদান করে। ২০০৪ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামান্যর জন্য ঢাকায় গ্রেনেড হামলা থেকে রক্ষা পান। ২০০৫ সালে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালায়।

    লীগ বিএনপি ও জামায়াতকে জঙ্গীবাদের উত্থানের সাথে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চচলীয় বিদ্রোহীদের বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে, এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রকট আকার ধারণ করে। খালেদা জিয়া চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রকাশ করেন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

    চতুর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৬-২০০৮)

    বিএনপির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একটি বড় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়, কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য নিরপেক্ষ প্রার্থীকে দাবী করে। বহু সপ্তাহ ব্যাপী হরতাল, বিক্ষোভ এবং অবরোধের কারণে দেশটি পঙ্গু হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু একটি সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী নির্বাচনের ভীতি দূর করতে ব্যর্থ হন। 

    ১১ জানুয়ারী ২০০৭ তারিখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমেদ জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ এর চাপের মুখে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডঃ ফখরুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন।

    সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করে, যার মধ্যে ১৬০ জন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আমলাকে গ্রেফতার করা হয়। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ খালেদা জিয়ার দুই ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্ষোভকারীগণ ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবী জানায়, কিন্তু কারফিউ দ্বারা আন্দোলন দমন করা হয়। ২০০৮ সালে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা মুক্তি পান। জরুরী অবস্থা দুই বছর ধরে অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে, যার মধ্যে জাতীয় পার্টি

    হাসিনা প্রশাসনের (২০০৯-বর্তমান)ইতিহাস

    কার্যনির্বাহী সভার দুই মাসের মধ্যে শেখ হাসিনার সরকারকে বিডিআর বিদ্রোহের মোকাবেলা করতে হয়, যা সেনা বিভাগের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহীদের হিংস্রতা ও ক্রুদ্ধ ব্যক্তিদের মোকাবেলা করে শেখ হাসিনার ব্যাপক সফলতার পরিচয় দেন।

     ১৯৭১ সালে গণহত্যার অন্যতম কারিগর পাকিস্তানপন্থী নেতাদের বিচারের জন্য তিনি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। ট্রাইব্যুনাল তার সুুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার ব্যাপারে সমালোচনার সম্মুখীন হয়। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা, বাংলাদেশ দলের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও গণহত্যার সময় পাকিস্তানকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত।

    ২০১০ সালে সংবিধানের মৌলিক নীতি হিসেবে বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্ট ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে জনমত পরিচালিত করে, যা প্রকাশিত হয় মার্চ ২০১৩ শাহবাগ প্রতিবাদের মাধ্যমে। মে ২০১৩ সালে হেফাজত-ই-ইসলামের নেতৃত্বে একটি ইসলামপন্থী সংগঠনও পাল্টা বিরাট সমাবেশ পরিচালনা করে। 

    ২০১৩ সালে এবং ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর এবং পাশ্চাত্যবাসী, ব্লগার, প্রকাশক ও নাস্তিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট অনেক গুলো হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে, যদিও হাসিনা সরকার স্থানীয়দের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে দায়ী করেন।

    আওয়ামী লীগ ও বিনপির মধ্যে সংঘাতকে প্রায়ই বেগমদের যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়। হাসিনা সরকার বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন বিলুপ্ত করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে একে নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে আওয়ামী লীগের পক্ষে দুর্নীতিযুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ জীবনে সহিংসতা বেড়ে যায়। 

    এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে হিংস্রতম নির্বাচন।২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকে বিএনপি বয়কট করে ; যেখানে জামায়াতকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক মিডিয়ায় নির্বাচনের সমালোচনা করা হয়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন।

    প্রাথমিক ও মধ্যযুগীয় সময়কালের ইতিহাস 

    ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর পূর্বে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। 

    আর্য জাতির আগমনের পর খ্রিষ্টীয় চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে অভিহিত করা হয়) শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ বাংলার অধিকাংশের অধিকারী হয়, এবং পরবর্তী চারশ বছর ধরে শাসন করে। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেন রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। দ্বাদশ শতকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। 

    পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১২০৫-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী নামের একজন তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে সেন রাজবংশের পতন ঘটান। ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা স্থানীয় সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মুঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ হয় জাহাঙ্গীর নগর।

    ঔপনিবেশিক সময়কাল

    বাংলায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানির হাত থেকে বাংলার শাসনভার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে।

    ব্রিটিশ রাজার নিয়ন্ত্রণাধীন একজন ভাইসরয় প্রশাসন পরিচালনা করতেন।[৩৯] ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে বহুবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লাখ লোক মারা যায়।

    শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ

    ১৯০৫ থেকে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যার রাজধানী ছিল ঢাকায়।[৪১] তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরম বিরোধিতার ফলে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ধর্ম গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পুনর্বার বাংলা প্রদেশটিকে ভাগ করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশভুক্ত হয়; অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশভুক্ত হয়। 

    ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়।[৪২] ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিস্বত্ব সংস্কারের মাধ্যমে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়।[৪৩] কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈরিতার প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়।[৪৪] পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। 

    এসময় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে আওয়ামী লীগের উত্থান ঘটে, এবং দলটি বাঙালি জাতির প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ৬ দফা আন্দোলনের সূচনা ঘটে যার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বাধিকার আদায়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে কারাবন্দী করা হয়। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চাপিয়ে আবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়; কিন্তু ঊনসত্তরের তুমুল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার পতন ঘটে এবং মুজিব মুক্তি পান।


    জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি স্মারক স্থাপনা

    ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে।

    মুক্তিযুদ্ধ


    ১৬ ডিসেম্বরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানের আত্মসমর্পন

    ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে টাল-বাহানা করতে থাকে | মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং 

    পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়।

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লাখ হতে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। দুই থেকে চার লক্ষ নারী পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়।

    আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। এই সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে।

    মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা’র কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।

    বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইতিহাস 

    বাংলাদেশের ভৌগোলিকঃ অবস্থান ২০°৩৪´ থেকে ২৬°৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১´ থেকে ৯২°৪১´ দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশটির পূর্ব-পশ্চিমে সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৪৪০ কিলোমিটার এবং উত্তর-উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৭৬০ কিলোমিটার।

    দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দুটি নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানেই কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠে পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র মোহনা অঞ্চলে প্রায় ৩০০০ বছর বা তারও পূর্ব থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তা-ই ইতিহাসের নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের স্বাধীন রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” রূপে। 

    ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে। এর ভূখণ্ড ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল (২২.২২ কিমি) এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০.৪০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর, আর পূর্ব সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভারত। তবে পূর্বে ভারত ছাড়াও মিয়ানমারের (বার্মা) সাথে সীমান্ত রয়েছে; দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। 

    ভারতের ৫টি রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম) এর সাথে বাংলাদেশের আন্তঃর্জাতিক সীমানা রয়েছে। বাংলাদেশের পশ্চিমে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য; উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য এবং পূর্বে রয়েছে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম। 

    বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৭ কিলোমিটার যার ৯৪ শতাংশ (৯৪%) ভারতের সাথে এবং বাকি ৬ শতাংশ মিয়ানমারের সাথে। বাংলাদেশের সমুদ্রতটরেখার দৈর্ঘ্য ৫৮০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম অনবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম।

    বাংলাদেশের উচ্চতম স্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোডক পর্বত, সমুদ্রতল থেকে যার উচ্চতা ১,০৫২ মিটার (৩,৪৫১ ফুট)[৫৫] এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্গ “বিজয়” (তাজিং ডং)-এর উচ্চতা ১,২৮০ মিটার যা রাঙ্গামাটি জেলার সাইচল পর্বতসারির অন্তর্ভূক্ত। বঙ্গোপসাগর উপকূলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের অনেকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। 

    এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল (টাইগার) বাঘ, চিত্রল হরিণ সহ নানা ধরনের প্রাণীর বাস। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই এলাকাকে বিলুপ্তির সম্মুখীন বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

    বাংলাদেশ ৮টি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত। এগুলো হল: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ। প্রতিটি বিভাগে রয়েছে একাধিক জেলা। বাংলাদেশের মোট জেলার সংখ্যা ৬৪টি। জেলার চেয়ে ক্ষুদ্রতর প্রশাসনিক অঞ্চলকে উপজেলা বলা হয়। 

    সারাদেশে ৪৯২টি উপজেলা (সর্বশেষ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা) রয়েছে। বাংলাদেশে মোট ৪,৫৫৪টি ইউনিয়ন; ৫৯,৯৯০টি মৌজা এবং ৮৭,৩১৯টি গ্রাম রয়েছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনে কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তা নেই; সরকার নিযুক্ত প্রশাসকদের অধীনে এসব অঞ্চল পরিচালিত হয়ে থাকে। ইউনিয়ন বা পৌরসভার ওয়ার্ডগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি রয়েছে। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে মহিলাদের জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়।

    এছাড়া শহরাঞ্চলে ১২টি সিটি কর্পোরেশন (ঢাকা-উত্তর, ঢাকা-দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ) এবং ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এগুলোর সবগুলোতেই জনগণের ভোটে মেয়র ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম শহর। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শহরের মধ্যে রয়েছে – চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর, যশোর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, বগুড়া ও দিনাজপুর।

    জলবায়ু ইতিহাস 

    জলবায়ুঃ বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে ৬টি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে যথা: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। বছরে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১৫০০-২৫০০ মি.মি./৬০-১০০ ইঞ্চি; পূর্ব সীমান্তে এই মাত্রা ৩৭৫০ মি.মি./১৫০ ইঞ্চির বেশি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াস। 

    বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষীয় প্রভাব দেখা যায়। নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এসময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, ও জলোচ্ছ্বাস প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশের কোনো না কোনো স্থানে আঘাত হানে।

    বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

    বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র সমতল হতে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সমুদ্র সমতল মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পেলেই এদেশের ১০% এলাকা নিমজ্জিত হবে বলে ধারণা করা হয়।

    বাংলাদেশ জনসংখ্যা কত ?২০২১

    মোট জনসংখ্যাঃ আদমশুমারি অনুযায়ী -২০২১ সাল বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা 18.7 কোটি চেয়েও বেশি -২০১১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। 

    এই আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.২ শতাংশ। সরকারি সংস্থা পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী জুন ২০১৪-এ জনসংখ্যা ১৫৬,৪৯৯,৬৭৩ জন বা ১৫.৬৪ কোটি। অন্য একটি প্রাক্কলন অনুসারে মার্চ ২০১৪-এ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫.৯৫ কোটি। 

    মোট জনসংখ্যার তালিকা । জেলা ভিত্তিক জনসংখ্যা

    মোট জনসংখ্যার তালিকা
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    বরিশাল১১৩৭২১০১১৮৭১০০২৩২৪৩১০
    ভোলা ৮৮৪০৬৯৮৯২৭২৬ ১৭৭৬৭৯৬
    পিরোজপুর ৫৪৮২২৮৫৬৫০২৯ ১১১৩২৫৭
    ঝালকাঠি ৩২৯১৪৭৩৫৩৫২২৬৮২৬৬৯
    পটুয়াখালী ৭৫৩৪৪১৭৮২৪১৩ ১৫৩৫৮৫৪
    বরগুনা ৪৩৭৪১৩৪৫৫৩৬৮৮৯২৭৯১
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    চট্টগ্রাম৩৮৩৮৮৫৪ ৩৭৭৭৪৯৮ ৭৬১৬৩৫২
    কক্সবাজার ১১৬৯৬০৪১১২০৩৮৬ ২২৮৯৯৯০
    বান্দরবন২০৩৩৫০১৮৪৯৮৫ ৩৮৮৩৩৫
    খাগড়াছড়ি৩১৩৭৯৩৩০০১২৪৬১৩৯১৭
    রাঙ্গামাটি৩১৩০৭৬২৮২৯০৩ ৫৯৫৯৭৯
    নোয়াখালী১৪৮৫১৬৯১৬২২৯১৪৩১০৮০৮৩
    ফেনী৬৯৪১২৮৭৪৩২৪৩ ১৪৩৭৩৭১
    লক্ষ্মীপুর৮২৭৭৮০৯০১৪০৮১৭২৯১৮৮
    কুমিল্লা২৫৭৫০১৮২৮১২২৭০৫৩৮৭২৮৮
    চাঁদপুর১১৪৫৮৩১১২৭০১৮৭ ২৪১৬০১৮
    ব্রাহ্মণবাড়িয়া১৩৬৬৭১১১৪৭৩৭৮৭ ২৮৪০৪৯৮
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    ঢাকা ৬৫৫৫৭৯২ ৫৪৮৮১৮৫ ১২০৪৩৯৭৭
    নারায়ণগঞ্জ ১৫২১৪৩৮১৪২৬৭৭৯২৯৪৮২১৭
    গাজীপুর ১৭৭৫৩১০ ১৬২৮৬০২ ৩৪০৩৯১২
    মুন্সিগঞ্জ ৭২১৫৫২ ৭২৪১০৮ ১৪৪৫৬৬০
    মানিকগঞ্জ ৬৭৬৩৫৯ ৭১৬৫০৮ ১৩৯২৮৬৭
    নরসিংদী ১১০২৯৪৩ ১১২২০০১ ২২২৪৯৪৪
    ফরিদপুর ৯৪২২৪৫ ৯৭০৭২৪ ১৯১২৯৬৯
    মাদারীপুর ৫৭৪৫৮২৫৯১৩৭০১১৬৫৯৫২
    গোপালগঞ্জ ৫৭৭৮৬৮ ৫৯৪৫৪৭ ১১৭২৪১৫
    রাজবাড়ী ৫১৯৯৯৯ ৫২৯৭৭৮ ১০৪৯৭৭৮
    শরিয়তপুর ৫৫৯০৭৫৫৯৬৭৪৯ ১১৫৫৮২৪
    টাঙ্গাইল ১৭৫৭৩৭০ ১৮৪৭৭১৩৩৬০৫০৮৩
    কিশোরগঞ্জ ১৪৩২২৪২ ১৪৭৯৬৬৫ ২৯১১৯০৭
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    জামালপুর ১১২৮৭২৪ ১১৬৩৯৫০ ২২৯২৬৭৪
    শেরপুর ৬৭৬৩৮৮ ৬৮১৯৩৭ ১৩৫৮৩২৫
    ময়মনসিংহ ২৫৩৯১২৪২৫৭১১৪৮৫১১০২৭২
    নেত্রকোনা ১১১১৩০৬ ১১১৮৩৩৬ ২২২৯৬৪২
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    খুলনা ১১৭৫৬৮৬১১৪২৮৪১ ২৩১৮৫২৭
    বাগেরহাট ৭৪০১৩৮৭৩৫৯৫২ ১৪৭৬০৯০
    সাতক্ষীরা ৯৮২৭৭৭ ১০০৩১৮২ ১৯৮৫৯৫৯
    যশোর ১৩৮৬২৯৩ ১৩৭৮২৫৪ ২৭৬৪৫৪৭
    ঝিনাইদহ ৮৮৬৪০২৮৮৪৯০২১৭৭১৩০৪
    চুয়াডাঙ্গা ৫৬৪৮১৯৫৬৪১৯৬১১২৯০১৫
    মাগুরা ৪৫৪৭৩৯৪৬৩৬৮০৯১৮৪১৯
    নড়াইল ৩৫৩৫২৭৩৬৮১৪১ ৭২১৬৬৮
    কুষ্টিয়া ৯৭৩৫১৮৯৭৩৩২০ ১৯৪৬৮৩৮
    মেহেরপুর৩২৪৬৩৪৩৩০৭৫৮৬৫৫৩৯২
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    রাজশাহী ১৩০৯৮৯০ ১২৮৫৩০৭ ২৫৯৫১৯৭
    নাটোর ৮৫৪১৮৩৮৫২৪৯০১৭০৬৬৭৩
    নওগাঁ ১৩০০২২৭১২৯৯৯৩০২৬০০১৫৭
    চাপাই নবাবগঞ্জ ৮১০২১৮ ৮৩৭৩০৩ ১৬৪৭৫২১
    পাবনা ১২৬২৯৩৪১২৬০২৪৫২৫২৩১৭৯
    সিরাজগঞ্জ ১৫৫১৩৬৮ ১৫৪৬১২১ ৩০৯৭৪৮৯
    বগুড়া ১৭০৮৮০৬১৬৯২০৬৮৩৪০০৮৭৪
    জয়পুরহাট ৪২৯২৮২ ৪৫৪৪৮৬ ৯১৩৭৬৮
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    রংপুর ১৪৪৩৮১৬১৪৩৭২৭০ ২৮৮১০৮৬
    গাইবান্ধা ১১৬৯১২৭১২১০১২৮ ২৩৭৯২৫৫
    নীলফামারী ৯২২৯৬৪ ৯১১২৬৭ ১৮৩৪২৩১
    লালমনিরহাট ৬২৮৭৯৯৬২৭৩০০১২৫৬০৯৯
    কুড়িগ্রাম ১০১০৪৪২ ১০৫৮৮৩১ ২০৬৯২৭৩
    দিনাজপুর ১৫০৮৬৭০ ১৪৮১৪৫৮ ২৯৯০১২৮
    ঠাকুরগাঁও ৭০১২৮১ ৬৮৮৭৬১ ১৩৯০০৪২
    পঞ্চগড় ৪৯৬৯২৫৪৭৯৮১৯ ৯৮৭৬৪৪
    জেলাপুরুষমহিলামোট
    সিলেট১৭২৬৯৬৫ ১৭০৭২২৩ ৩৪৩৪১৮৮
    হবিগঞ্জ১০২৫৫৯১ ১০৬৩৪১০ ২০৮৯০০১
    মৌলভীবাজার৯৪৪৭২৮ ৯৭৪৩৩৪ ১৯১৯০৬২
    সুনামগঞ্জ১২৩৬১০৬ ১২৩১৮৬২ ২৪৬৭৯৬৮
    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রাক্কলন ১৫.৮৫ কোটি। এই হিসাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮ম জনবহুল দেশ। জনঘনত্ব প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ২৪৯৭ জনের বেশি।

    ২০১১-এর আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী পুরুষ ও নারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৭ কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার এবং ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার অর্থাৎ নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০:১০৩। জনসংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম দেশ। 

    এখানে জনবসতির ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১,০৫৫ জন, যা সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ (কিছু দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র বাদে)। দেশের অধিকাংশ মানুষ শিশু ও তরুণ বয়সী: যেখানে ০–২৫ বছর বয়সীরা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ, সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা মাত্র ৩ শতাংশ। এদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের গড় আয়ু ৭১.৫ বছর।

    নোবেল পুরস্কারে ভূষিত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র বিমোচনে বিশেষ অবদান রেখেছেন।

    জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। বাকি ২ শতাংশ অধিবাসী বিভিন্ন উপজাতি এবং বিহারী বংশোদ্ভূত। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩টি উপজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা ও মারমা উপজাতি প্রধান। 

    পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের উপজাতিগুলোর মধ্যে গারো ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, কক্সবাজার এলাকায় বার্মা থেকে বিতাড়িত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে; বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী।

    সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে দারিদ্র বিমোচন ও জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক গড়ে দৈনিক মাত্র ১ মার্কিন ডলার আয় করে (২০০৫)। সরকারি হিসেব 

    অনুযায়ী মাথাপিছু আয় বর্তমানে ১ হাজার ৫শ মার্কিন ডলারের বেশি। আর্সেনিকজনিত বিষক্রিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৯০ দশকের শেষভাগে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

    ধর্ম 

    বাংলাদেশের ধর্ম সাধারণত তিন প্রকার-
    1. ইসলাম ধর্ম
    2. হিন্দু ধর্ম
    3. বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্ম

    খেলাধুলা-

    বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু বা কাবাডি। এই খেলার মতোই বাংলাদেশের অধিকাংশ নিজস্ব খেলাই উপকরণহীন কিংবা উপকরণের বাহুল্যবর্জিত। উপকরণবহুল খুব কম খেলাই বাংলাদেশের নিজস্ব খেলা। উপকরণহীন খেলার মধ্যে এক্কাদোক্কা, দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, কানামাছি, বরফ-পানি, বউচি, ছোঁয়াছুঁয়ি ইত্যাদি খেলা উল্লেখযোগ্য। 

    উপকরণের বাহুল্যবর্জিত বা সীমিত সহজলভ্য উপকরণের খেলার মধ্যে ডাঙ্গুলি, সাতচাড়া, রাম-সাম-যদু-মধু বা চোর-ডাকাত-পুলিশ, মার্বেল খেলা, রিং খেলা ইত্যাদির নাম করা যায়। যেহেতু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যকীয়ভাবে সাঁতার শিখতে হয় তাই সাঁতার বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায় ছাড়া জনসাধারণের কাছে আলাদা ক্রীড়া হিসেবে তেমন একটা মর্যাদা পায় না। 

    গৃহস্থালী খেলার মধ্যে লুডু, সাপ-লুডু, দাবা বেশ প্রচলিত। এছাড়া ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো বিভিন্ন বিদেশী খেলাও এদেশে বেশ জনপ্রিয়। অন্যান্য খেলার মধ্যে হকি, হ্যান্ডবল, সাঁতার, কাবাডি, গলফ, আর্চারি এবং দাবা উল্লেখযোগ্য। এ যাবৎ ৫জন বাংলাদেশী- নিয়াজ মোর্শেদ, জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব এবং এনামুল হোসেন রাজীব দাবায় গ্র্যান্ড মাস্টার খেতাব লাভ করেছেন|

    By commenting you acknowledge acceptance of Whatisloved.com-Terms and Conditions

    Post a Comment

    By commenting you acknowledge acceptance of Whatisloved.com-Terms and Conditions

    Post a Comment (0)

    Previous Post Next Post