গল্পের নাম -শিশিরের বিন্দু-অনেক মজার একটি গল্প-পার্ট-(১-২৬)

❒শিশিরের বিন্দু -গল্পের পার্ট-(১-২৬)

❒লেখকঃ- শিলা আক্তার

❒সংগ্রহঃ-ফেসবুক পেজ 

বন্ধুরা এই শিশিরের বিন্দু গল্পটা অনেক বড় তাই এখানে ক্যাটাগরি আকারে দেওয়া হল, আপনার গল্পের  কত নম্বর পার্ট পড়তে মন চাইছে সেখানে শুধু ক্লিক করুন তাহলে সেই জায়গায় পৌছাবেন এবং পড়া শুরু করুন -

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(১)

হঠাৎ আমার পাশে কেউ বসে বলতে লাগল,,,আন্টি একটু চেপে বসবেন আমার সমস্যা হচ্ছে? আন্টি বলাতে রেগে তাকালাম আমি কোনদিন দিয়ে আন্টি অসভ্য ছেলে রেগে উঠে দাড়িয়ে বলতে লাগলাম,,,উঠুন আর কিছু বলতে পারলাম না ঝাকিতে ছেলেটির কোলের উপর পরে গেলাম ভুল বশত আমার মুখ গিয়ে টাচ করলো ছেলেটির ঠোটে। দুজনের কেউই এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না হা হয়ে তাকিয়ে আছি দুজন দুজনের দিকে।
 
_ এটা কি হলো;
_ আপনার জন্য শুধু মাএ আপনার জন্য এমন একটা,
বলেই কেদে দিলাম। ছেলেটা হা করে তাকিয়ে আছে আমার কান্নার দিকে।
_ আপনি কাদছেন কেন? 
_ কাদবো না আপনি জন্য আমার সব শেষ কতো আসা ছিলো প্রথম চুমু টা আমি আমার বরকে দেবো। সেটা আপনার জন্য হলো না।

শিশির তো হতবাক হয়ে তাকিয়ে কথা শুনছে এই মেয়ে বলে কি এমন কথা কেউ বলে কিনা জানা নেই।
বিন্দু এখন ও শিশিরের কোলেই বসে আছে কাদছে আর নাক টানছে হঠাৎ নাক ঝেরে শিশিরের শাটে মুছলো।

শিশির সঙ্গে সঙ্গে বিন্দুকে কোলে থেকে ঠাস করে ফেলে দিয়ে।
_ ছি ছি ছি কি বাজে মেয়ে? ছি কি করলেন এটা আপনি, ( নাক ছিটকে)
হঠাৎ পরে যাওয়ায় বিন্দু কান্না থামিয়ে দিলো সে পরলো কি করে তার মানে ছেলেটার কথা শুনে রাগি চোখে তাকিয়ে,,,,

_ আপনি আমায় ফেলে দিলেন?
_ হ্যা ছি কি বাজে আপনি দেখুন কি করেছেন আমার শার্ট।
_ এই সামান্য কারনে আপনি আমায় ফেলে দিবেন এখন যদি আমার পা ভেঙে যায় তাহলে আমি পালাবো কি করে।

- হুয়াট
_ আপনার জন্য যদি আমার পা ভেঙেছে তো আপনাকে আমি।
বলেই হাত উঠিয়ে মারতে যায়। আশে পাশের লোক সব জরো হয়ে গেছে ঝগড়া শুনে।
_ কি হয়েছে এখানে
 
কারো কথায় বিন্দু আশেপাশে তাকিয়ে দেখে ট্রেনের সব যাএী  ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বিন্দু তারাতারি সিটে বসে পরলো না না বিন্দু মাথা ঠান্ডা কর এটা পাবলিক জায়গা এখানে ঝগড়া করা যাবে না সবাই যদি গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়।

সবাই শিশির কে ঝেকে ধরে কি হয়েছে এতো চেচামেচি কেন কি বলবে ভেবে না পেয়ে কিছু না বলেই সিটে এসে বসে পরে দেখে ওই মেয়ে টা বোরকা খুলছে এবার বুঝতে পারলো মেয়েটার রাগে কারণ একে তো আমি আন্টি বলেছিলাম বোরকা আর হিজাবে তাকে এটাই ভেবেছিলাম। 
শিশির টিসে বের করে শাট মুছতে লাগল,,,,আর

_ আপনার মতো মেয়ে আমি জীবনে দেখি নি। কি করলেন ওয়াক।
_ একদম বাজে কথা বলবেন না ঠিক হয়েছে আমাকে আন্টি বলা না আবার ফেলে দেওয়া।
_ আমি আপনাকে ইচ্ছে করে ফেলি নি আর তখন আপনাকে আন্টি লাগছিল।
_ ইউ আবার আমাকে আন্টি বলছো,, তুমি জানো কতো ছেলের ক্রাশ আমি আর তুমি আমাকে আন্টি বলছো।

এই মেয়ের অহংকার বেশি এর সাথে কথা না বাড়ানোই ভালো। দেখতে অবশ্য খারাপ না কিন্তু এমন অহংকারী মেয়ে অসহ্য লাগে। ভেবেই শিশির চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
বিন্দু কি করবে ভেবে ফোন বের করে গান ছেরে কানে ইয়ার ফোন দিলো। গান শুনছে আর ডোলছে শিশির বিরক্ত হয়ে তাকালো মেয়েটির দিকে।

_ এই যে আপনি নাচচ্ছেন কেন?
_ হুয়াট আমি নাচছি কোথায় আপনার চোখ কি অন্ধ নাকি চোখে দেখেন না।
_ না আমার চোখ ঠিকি আছে আপনার এই দোলা আমার কাছে নাচ মনে হচ্ছে দয়া করে একটু শান্ত হয়ে বসে থাকেন আমার প্রবলেম হচ্ছে।

_ আপনার কথা মতো আমাকে চলতে হবে আমি যা করছি সবই তো আপনার প্রবলেম হচ্ছে। এতো প্রবলেম হলে উঠে অন্য জায়গায় বসুন একদম আমাকে ডিসটার্ব করবেন না।

শিশির আর কিছু বলল না এই মেয়ের সাথে কথায়  পারা যাবে না। চুপ করে আছে হঠাৎ কিছু পলে যাওয়ায় তাকিয়ে দেখে মেয়েটা ভয়ে নিয়ে ফোনটা নিচে পরে গেছে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা ফোন এসেছে। কিন্তু ফোন দেখে এতো ভয়ের কি আছে। অবাক হ য়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি।
চলবে.....

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(২)

মারিয়া আফরিন নুপুর-
___ " বুবু তোর বুকের উপরের তিলটা দেখা যাচ্ছে "।
কণা খিল খিল করে হেসে বলে উঠলো। বিন্দু শাড়ি ম্যানেজ করতে হিমশিম খাচ্ছে তারউপরে কনার এই ফাজলামি আর নিতে পারলো না। শাড়ি ঠিক করা বাদ দিয়ে কনার চুলে হ্যাঁচকা টান দিল বিন্দু। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কনার দিকে তাকিয়ে বলল, 

___ " চান্দু এই দিন দিন না আরো দিন আছে,এই দিনেরে যাইতে হবে ওই দিনেরই কাছে। আজকে আমার বিয়ে নিয়ে মজা করতেছিস খালি সময় আসুক তোর বিয়ের দিন তোরে ঘোল খাওয়াবো আমি "।
___ " যা যা খালি খালি ফাঁপড় নিস না "।

কণা মুখ ভেঙচি কেটে বলল। বিন্দু কথা কাটাকাটি বাদ দিয়ে রেডি হতে বসল। লাল কালো মিশেলে একটা শাড়ি পরেছে ও। উজ্জ্বল শ্যামলা শরীরে শাড়িটা যেন একদক খাঁপ খেয়ে গেছে। কণা ওর বোনের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল খুব বড় করে। যত যাই বলুক না কেন এই বোন যে ওর সব কিছুর সাথী। হুট করে এমন ছেলে পক্ষ যে বিন্দুকে দেখতে আসবে সেটা কণা বুঝতেই পারেনি। যদি বিন্দুর বিয়ে হয়ে যায় তখন কি হবে সেটা ভেবেই এই বিশাল দীর্ঘশ্বাস। কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরো বিন্দু আর সাথে হাতে দিল কালো চুড়ি। চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপষ্টিকের ছোঁয়া। কনা ওকে দেখে তাড়াতাড়ি কাশি দিতে দিতে বলল,

___ " বুবু আজকে তোরে এত এত কিউট লাগতেছে ছেলে তো ট্যারা হয়ে যাবে তোকে দেখে। "
___ " আমি বুঝলাম না আব্বু হুট করে আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য এত এত পাগল হল কেন।"
বিন্দ্যলু বিরক্তির স্বর তুলে বলল। কনা হাই দিয়ে বলল,
___ " ভালই হইছে আমার রাস্তা ক্লিয়ার হল।"
___ " তবে রে "। 

এই বলেই বিন্দু কনাকে ধরতে গেল আর কনা দিল দৌড়। সামনেই রুমে ঢুকতেছিল রাহেলা। বিন্দু আর কনার মা। মায়ের সাথে ধাক্কা লাগতেই কনা দাঁড়িয়ে পড়ল। আর বিন্দু এই কাহিনি দেখে মুচকি হেসে আবার ড্রেসিং টেবিলের দিকে ঘুরে সাজগোজে মন দিল। রাহেলা বেগম চরম বিরক্ত হয়ে কনার দিকে তাকিয়ে বলল,

___ " আমার আসলে ভুল হয়ে গেছে বিন্দুর আগে তোর বিয়ে দিতে বলা উচিত ছিল তোর বাবার কাছে "।
___ " মানা করেছে কে মা আমি তো চার পায়ে খাঁড়া! "
হাসতে হাসতে কনা বলল। বিন্দু আর রাহেলা অবাক হয়ে কনার দিকে তাকিয়ে রইল। রাহেলা ভ্রু কুঁচকিয়ে বললে, 

___ " চার পা মানে? তোর চার পা আসলো কোথা থেকে "?
___ " মা আমি তোমার আর আমার দুইজনের পা মিলিয়ে বলেছি "।
এই বলেই খিলখিল করে হেসে দৌড়ে সরে গেল কনা। রাহেলা বেগম ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে কতক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন এই মেয়েকে নিয়ে কি যে করবে ও সেটা নিজেও জানে না।

বড়টা ভীষন শান্ত আর ছোটটা হইছে আল্লাহর দুনিয়ার অশান্ত নাম্বার ওয়ান। কই যে যাবে এদের নিয়ে। রাহেলার বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 
___ " রেডি হয়েছিস মা!  ছেলেরা কিন্তু কাছাকাছি এসে পড়েছে। "

বিন্দু কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। বিন্দুর বড় ভাই সুর এসে রাহেলার দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " মা তুমি এখানে, আব্বু সারা বাসা খুঁজতেছে তাকে ছেলেরা চলে এসেছে বাসার সামনে "।

সুরের কথা শুনে বিন্দুর পেটের ভিতরে যেন প্রজাপতি উড়তে লাগল কেমনই যেন লাগতে লাগল ওর। রাহেলা আর সুর দুইজনে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। বিন্দু শুধু এটুকুই জানে যে ওকে দেখিতে আসছে তার নাম শিশির। কালকে কনা অনেক্ষন হাহা হিহি করেছে এই নাম নিয়ে বারেবার বলেছে শিশিরের বিন্দু। ভালই মানিয়েছে নাম দুইটো।

মেয়েদের বাড়ির সামনে নেমে সবাই হাঁ কিরে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশাল আলিশান বাড়ি একটা। শিশিরদের বাড়িও বড় কিন্তু এ বাড়িটা যেন তার চেয়েও অন্যন্য। আবির শিশিরের কানে কানে বলল,

___ " দোস্ত এ বাড়ির জামাই হলে তো তুই গোল মারবি। দেখেছিস কি সুন্দর বাড়ি "।
___ " এত শখ হলে তুই বিয়ে করে নে "।

শিশির কিটমিটিয়ে বলে উঠলো। হাবিব সাহেব ড্রাইভারদের গাড়ি থেকে মিষ্টি আর ফল বের করতে বলে অন্যদের তাড়া দিলেন ভেতরে যাওয়ার জন্য। সবাই বাড়ির নিচে যেতেই কিবরিয়া সাহেব মানে বিন্দুর বাবা বেরিয়ে এলেন। হাবিব সাহেবকে বুকে জড়িয়ে ধরলে উনি। পেছনে পেছনে কিবরিয়া সাহেবের ছেলে মানে বিন্দুর বড় ভাই বেরিয়ে এলো। সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষে ড্রইংরুমে বসল ওরা৷ ছোট চাচ্চু শিশিরের কানের কাছে এসে বললেন,

___ " দেখেছিস শিশির এদের চয়েজ অনেক হাই ক্লাসের বাড়িটা কত সুন্দর করে সাজিয়েছে। "
শিশির কিছু না বলেই চুপ করে বসে রইল। যে আছে যার জ্বালায়। কথাবার্তার মধ্যেই রাহেলা আর কনা দুজনে বিন্দুকে নিয়ে এসে হাজির হল। শিশির চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। 

আর বাকি সবাই তো মেয়ে দেখে পুরোই ফিদা। গায়ের রঙটা যেন আল্লাহ পারফেক্ট করে দিয়েছেন মেয়েটাকে। তার উপরে শাড়িতে যেন একদম পুতুলের মত লাগছে বিন্দুকে। মেয়ে দেখে তো জাহানারা আর হাবিব সাহেব মহা খুশি। দেখতেই লক্ষী পনা স্বভাবের। বিপ্লব শিশিরকে খোঁচা মেরে বলল, 
___ " দোস্ত ভাবি তো সেই লেভেলের। যাকে বলে হেব্বি "।

___ " লাজবাব রে। তোর কপালটাই ভাল। "
বিপ্লবের সাথে আবিরও সায় দিল। সেই প্রথম শিশির মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালো। লাল কালো শাড়িতে যেন এক অপ্সরা বসে আছে ওর সামনে। তারপরও শিশিরের মনে হচ্ছে এক্ষনি কেন বিয়ে। কনা হাঁ করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে পাত্র কে। 

তিন তিনটা ছেলে একসাথে বসে আছে। কিন্তু ছেলে যে কোনটা সেটা কনা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। এর মধ্যে নাস্তা নিয়ে আসলো কাজের লোকরা। সবাই যে যার মত কথা বলছে আর কনা এখনও বুঝতেছে না শিশির কোনজন। সামনের তিনটাই আড়চোখে বারেবার এদিকে তাকাচ্ছে। আবির শিশিরের কাছে এগিয়ে যেয়ে বলল,

___ " দোস্ত তোর শালিটা কিন্তু....... সব ভালয় ভালয় হয়ে গেলে শালি আমার নামে রেজিষ্ট্রেশন করে দিবি। " 
রাগে দুঃখে শিশির পাগল প্রায় আর এরা আছে  শালি নিয়ে টানাটানি। বিপ্লব কিছু বলতে যাবে ঠিক তখন শিশির ওর হাত চেপে ধরে বলল,

___ " দেখ বিপ্লব শিশির এমনিতেই আমার ব্রেইনের অবস্থা দই বানায়ে দিছে। তোর পায়ে ধরি সেই দই দিয়ে তুই প্লিজ ঘোল বানাইস না। "

সব কথা বার্তা শেষে হাবিব সাহেব কিবরিয়া সাহেবকে বললেন, 
___ "বন্দু মেয়ে আমাদের অনেক পছন্দ হয়েছে৷ এখন তুমি বলো কবে বিন্দু মা কে আমি আমার বাসায় নিয়ে যাব।"
বাবার কথা শুনে শিশিরের মাথার চুল ইলেট্রিক শক খেলে যেমন দাঁড়িয়ে যায় ঠিক  তেমনি দাঁড়িয়ে গেল। বিয়ে মানেটা কি?  চেনা নেই জানা নেই হুট করে বিয়ে। কিবরিয়া সাহেব হেসে বলল,
___ " হজ্বে তো সবাই এক সাথেই যাচ্ছি তাহলে হজ্বের আগেই বিয়েটা সারি কি বলো।"
___ " একদম আমার মনের কথা বলেছ "।

হাবিব সাহেব জাহানারার দিকে তাকিয়ে বললেন,
___ " কি শিশিরের মা তুমি কি বলো "।
___ " আমি তো অপেক্ষায় আছি কবে ঘরের লক্ষী ঘরে নিয়ে যাব "।

হেসে বললেন জাহানারা।  বিন্দু একপলক তাকিয়ে সামনে দেখলো ডীপ ব্লু শার্ট আর কালো প্যান্টে এক ছেলে নিচের তাকিয়ে আছে। কেন জানি না ওর মনে হল এই হয়ত শিশির হবে। আবির বিপ্লব এর খুশি যেন ধরতেছে না। এমন হুট করে বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে শিশিরের এটা যেন ভাবতেই পারে নি ওরা।

এক সপ্তাহ পরে বিয়ের দিন ঠিক করল সবাই।  মিষ্টি মুখ করার পরে শিশিরের কাছে মনে হতে লাগল অ যেন কুরবানীর গরু। যাকে জবাই করার আগে একবারও কেউ জিজ্ঞেস করল না যে, " ব্যাটা গরু তোর কি জবাই হওয়ার ইচ্ছা আছে কি না "।

আসলে মানুষ ঠিকই বলে যার বিয়েভতার খবর নেই পাড়া পড়শীর ঘুম নেই। শিশির আবির আর বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে দেখলো দুইটায় পারেনা খালি নাচতে। ছোট ফুপি আর আর চাচ্চুও আনন্দে বাকবাকুম করতেছে। বিন্দু মাথা নিচু করে চুপ করে বসে আছে। 

হঠাৎ এমন করে বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে সেটাও নিজেও বুঝতে পারে নি। ছোট চাচ্চু এমন সময় হাবিব সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " ভাইয়া শিশির আর বিন্দুকে একটু আলাদা কথা বলতে দিলে হতো না।আফটার অল ওদের ও তো একটা মতামত আছে।"
হাবিব সাহেব হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলেন ওকে। কড়া গলায় বললেন,
___ " ছোটন তুমি কি জানো না যে আমাদের ফ্যামিলিতে বিয়ে আগে ছেলে মেয়ের সাথে কথা বলা নিষেধ  "।

এর পরে আর কেউই কথা বাড়ালো না। শিশির মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দিতে লাগল এই বলে যে, থাক মেয়ে তো বিয়ের আগে দেখার নসীব হয়েছে তার যেই বাপের বাপ দেখা যেত বিয়ের দিন বলত " উঠ ছ্যামড়া আজকে তোর বিয়ে "। 

কথাবার্তা শেষে সবাই উঠলো।বিদায় নেওয়া শেষ করে সবাই আস্তে আস্তে বের হতে লাগল। শিশির ছিল সবার শেষে।  হঠাৎ ও টের পেল ওর হাত কে যেন টেনে ধরেছে, ঘুরে ও যা দেখলো তাতে ওর কেমন জানি হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল। ও দেখলো....... 
চলবে -
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(৩)

শিশির ঘুরে তাকিয়ে দেখলো কণা হাত টেনে ধরেছে। শিশিরকে ঢোক গিলতে দেখে কনা হেসে উঠলো। 
___ " ভাইয়া বিয়েতে গায়ে হলুদে রেডি থাকবেন কিন্তু"।
___ " রেডি থাকবো মানে? "
শিশির জোর করে হেসে বলল। কণা চোখ টিপ দিয়ে বলল,
___ " এক্সট্রা খাতির যত্ন করতে হবে তো আপনার "।

তখন শিশিরকে বাইরে থেকে ছোট ফুপি ডাক দিল। কোন মতে পড়িমরি করে শিশির এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো। কনা আর শিশির কথা গুলো বিন্দু শুনছিল পর্দার ওপাশ থেকে। এত এত হাসি আসছিল যে ওর বলার মত না। 

সেদিন বাসায় আসার পর থেকে শিশির এত এত মন খারাপ করেছে যে বলার মত না। রুমের লাইট অফ করে শিশির আকাশ পাতাল ভাবছিল আর নিজের কপালের উপর নিজেরই আক্ষেপ করছিলে এই বলে যে, " কোন খুশিতে যে বাবাকে এত ভয় পায় ও, ইচ্ছা করছে ওর সোজা বাবার সামনে যেয়ে বলে দিক এই বিয়ে ও করবে না। কিন্তু কিছুই করার নেই বাবাকে বলতেও পারবে না বিয়ে আটকাতেও পারবে না। 

এমন সময় দরজায় নক করল কে যেন,বাইরে শুনতে পেল ছোট চাচ্চুর গলা। রুমে ঢুকেই আগে লাইট জ্বালালো ছোট চাচ্চু। শিশিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " আচ্ছা বল তো তোর হইছেটা কি? "
___ " আমার আবার কি হবে? কিছুই হয় নাই! " 
___ " যেদিন থেকে বিয়ে ঠিক হইছে সেদিন থেকে চেহারার এমন হাল বানায়ে রাখিছিস দেখলে মনে হচ্ছে কঠিন আমাশয় চলছে তোর "।
___ " ফাউ কথা,বলো না তো চাচ্চু "।
গল্পের নাম -শিশিরের বিন্দু-অনেক মজার একটি গল্প-পার্ট-(১-১৬)
গল্পের নাম -শিশিরের বিন্দু
___ " তাহলে কাজের কথা শোন, কালকে বিয়ের শাড়ি কিনতে যাচ্ছি সবাই তুইও যাবি "।
___ " বিয়েতে কি আমি শাড়ি পরব নাকি যে আমার শাড়ি কিনতে যেতে হবে "।
শিশির বিরক্ত হয়ে বলল। ছোট চাচ্চু ব্যাঙের মত মুখ করে বলল,
___ " বাবা হারাধন বিয়ের শাড়ি কিনতে ছেলের যেতে হয় রেডি থাইকেন "।

এই বলেই চাচ্চু চলে গেলেন। শিশির গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসল ও করবেটা কি।
রাতে ভাত খাওয়ার সময় হাবিব সাহেব শিশিরকে বললেন, কালকে শপিংয়ে যেতে হবে সবার সাথে। শিশির ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে চুপ হয়ে গেল। 

খাওয়া শেষে ছাদে যেয়ে দোলনায় বসে আকাশ দেখতে লাগল শিশির।মনে হতে লাগল বিয়ে মানে জীবনটাই তেজপাতা হওয়ার পালা। মনে মনে ভাবলো যে করেই হোক এই বিয়ে ভাঙতেই হবে। কিন্তু কি ভাবে?  অনেক ভেবে চিন্তে একটা প্লান বের করল ও। সাথে সাথে আবিরকে কল করে বলল, কালকে খুব সকালে যেন ও চলে আসে ওদের বাসায়। ইমপর্টেন্ট কাজ আছে। আবিরের বারেবার জিজ্ঞেসা করা স্বত্তেও শিশির বললনা যে ও কালকে করবেটা কি। 

ফোন রেখেই শিশিরের মন খুব ভাল হয়ে গেল। যদি এই প্লান কাজে লেগে যায় তো এই বিয়েটা আর ওকে করতে হবে না। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বিছানায় গেল ও। গত দুই দিন একদম ঘুম হয় নি ওর চিন্তায় চিন্তায়। আজকে বড়ই শান্তির ঘুম হবে নির্ঘাৎ। 

এসব ভাবতে ভাবতেই শিশির তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। 
বেশ সকালে বিন্দু ঘুম থেকে উঠলো।প্রতিদিন ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠা ওর অভ্যাস।পাশে তাকিয়ে দেখলো কনা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে৷ প্রতিদিন সকালে বিন্দু ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষন ব্যায়াম করে ছাদে বসে। কানে হেড ফোন দিয়ে ছাদে এসে ব্যায়াম করা শুরু করল। বিন্দুদের বাউন্ডারির বাইরেই শিশির আর আবির গাড়ির ভিতরে বসা। 

কনাকে টিশার্ট আর টাইসে দেখে শিশির এর তো চোখের পলকই পড়ে না সেই অবস্থা। মেদহীন ফিট বডি।দেখে মনে হচ্ছে মিনিমাম সাড়ে পাঁচ ফিট লম্বা আর চুল গুলো চূড়া করে ঘাড়ের উপরে উঠিয়ে বেঁধেছে। এত এত সুন্দর লাগছে ওকে দূর থেকে মনে হচ্ছে গ্রীক দেবী ভেনাসের মূর্তি। 

কেউ যেন পাথর কুঁদে তৈরি করেছে ওকে। হঠাৎ আবিরের কথায় ওর হুশ ফিরলো। আবির বলল,
___ " মামারে তোর বউ তো, কি আর বলব ভাবি হয় না হলে কিছু তো একটা উপমা দিতাম। যাই হোক এই সাত সকাল বেল ঘুম থেকে উঠে ভাবির কোঁদাকুদি দেখতে আসাটা সার্থক হল।"
মুখে একটা হাসি টেনে বলল আবির।শিশির চোখ গরম দিয়ে বলল,
___ " ওটা ভাবি হয় তোর সম্মান দিয়ে কথা বল।"
___ " তো ভাবিরে কি যেন বলবি, দেবো ডাক উনারে "।
___ " কিছু বলা লাগবে না বাসায় চল "।

আবির অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শিশিরের দিকে। শিশির ভেবেছিল আজকে বিন্দুকে বলবে, ও যেনো ওর বাবাকে বলে বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে থাকুক না হোক না বিয়েটা। শিশির আনমনে গাড়ি চালাতে লাগল। বাসায় ঢুকে গাড়ি গ্যারেজে রাখতেই ও দেখলো চমক কোমরে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ শিশিরের দিকে তাকিয়ে ও বলল,
___ " ভাইয় তুই গেছিলি কই "।
___ " জগিংয়ে গেছিলাম "।
দায় ছাড়া উওর দিল শিশির। চমক হেসে দিয়ে বলল,
___ " গাড়ি নিয়ে জগিংয়ে যেতে এই কাউকে প্রথম শুনলাম।"

আবির মুখ টিপে হাসতে লাগল। শিশির আবিরের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙ্গানি দিয়ে থামিয়ে দিল। নাস্তা খেয়ে জাহানারা বেগম আর ছোট ফুপি রেডি হল শপিং এ যাওয়ার জন্য। সাথে আছে আবির আর শিশির। জ্যাম ঠেলে বসুন্ধরায় আসতে আসতে ওদের প্রায় এগারোটা বেজে গেল। জাহানারা বেগম রাহেলাকে কল দিয়ে শুনলেন ওরা অনেক আগেই এসে বসে আছে। 

জাহানারা আর ছোট ফুপিকে বসুন্ধরার মেইন গেটে নামিয়ে দিয়ে শিশির আর আবির চলল বেইজমেন্টে গাড়ি পার্ক করার জন্য। আবির আর শিশির দুজনে গাড়ি পার্ক করে যখন উপরে উঠতে লাগল, তখন আবির বলল, 
___ " দোস্ত ভাবি কি আইছে রে "?
___ " আমি কি করে বলব  "।
শিশির গম্ভীর মুখে উওর দিল। আবির আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে লাগল। শপিং মলের মধ্যে ঢুকে শিশিরের হার্টবিট যেন বহুগুনে বেড়ে গেল। সামনে বিন্দু দাঁড়িয়ে আছে তাও সাদা ধবধবে একটা লং ফ্রক পরে এসেছে ও কাঁধের উপরে হালকা গোলাপী একটা ওড়না। মাথার চুল গুলো ছেড়ে এসেছে আর সেগুলো কোমড় ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। 

শিশিরের বুকের বাঁ পাশে যেয়ে যেন লাগল সেই অনুভূতি। বিন্দু লজ্জায় তাকাতেই পারছে না। বটল গ্রীন টিশার্ট আর কালো জিন্স পরা শিশিরকে দেখেই ওর বুকের ধকধকানি হাজার গুনে বেড়ে গেছে যে ভয় হচ্ছে সেই শব্দ বাইরের কেউ যেন শুনে না ফেলে। বিন্দু এখান থেকেই টের পাচ্ছে শিশিরের শরীরের কড়া পারফিউমের ঘ্রান।

জাহানারা আর রাহেলা দুজনেই তাড়া দিলেন অনেক কিছু কেনার বাকি। আজকে মার্কেটে প্রচুর ভিড়। ক্যাপসুল লিফটে একতিল মানুষ দাঁড়ানোর জায়গা নেই। সবাই খুব চাপাচাপি করে উঠলো। বিন্দু একদম শিশিরের বুকের ঘেঁসে দাঁড়ালো। 

শিশির যেন একদম নট নড়ন নট চড়ন হয়ে গেল। ওদিকে আরো একজন মানুষ উঠলো দোতালা থেকে।বিন্দু আরো এগিয়ে গেল শিশিরের দিকে। বিন্দুর গরম নিঃশ্বাস পড়তে লাগল শিশিরের বুকে। শিশিরের আজ অন্য এক অনুভূতি হতে লাগল এমন তো আগে তো কখনও হয় নি ওর। 

হঠাৎ লিফট থামতেই বিন্দুর যেন কেমন লাগে ও খামচে ধরে শিশিরের টিশার্ট ধাক্কা সামলাতে না পেরে শিশির ওকে জড়িয়ে ধরে। মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের কাহিনী কিন্তু অসম্ভব এক ভাল লাগার রেশ রেখে গেল ওদের দুজনের মধ্যেই.....
চলবে 
মারিয়া আফরিন নুপুর-

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(৪)

চমক বিন্দুকে ঘাড় এদিক সেদিক ঘুরাতে দেখে বলল,
___ " ভাবি সবুর করো সবুরে মেওয়া ফলে "।
এই বলেই চোখ টিপ দিল। বিন্দু লজ্জায় আঁচলের আড়ালে মুখ লুকালো। কিবরিয়া সাহেব আজ খুব খুশি। বিন্দু তো তার মেয়ে না বিন্দু হল তার মা। 

আজ যেমন সে খুশি তেমনি মনের কোনায় চিনচিনে একটা ব্যাথা কাজ করছে। মেয়েটা যে অন্যের বাড়িতে চলে যাবে। হাবিব সাহেব কোথা থেকে এসে যেন কিবরিয়া সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন। এতদিনে শিশিরকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে পেরেছেন এর চেয়ে খুশির আর কি হতে পারে? দুই হবু বিয়াই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন। 

ওদিকে জাহানারা আর রাহেলাও নানান কথায় মেতে উঠলো। চমক আর কনা বিন্দুর সাথে মজা করতে লাগল। কিন্তু বিন্দু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেছে শিশিরের জন্য। কিন্তু শিশির এখনও আসছে না কেন। ওদিকে বেশ সময় বয়ে যাচ্ছে শিশিরের কোন খবরই নেই। হাবিব সাহেব সাইডে এসে শিশিরকে কল দিলেন। নাম্বার অফ। এই প্রথম উনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া শুরু হল। 

পরে উনি আবিরের নাম্বারে কল দিলেন। আবির কল কেটে দিয়ে একটু পরেই হাবিব সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালো। আবিরকে দেখে হাবিব সাহেব বলল,

___ " আবির শিশির কোথায়? এত সময় হয়ে গেল এখনও আসছে না কেন? আর তোমার আর বিপ্লবের তো ওর সাথেই আসার কথা ছিল তোমরা এখানে কেন?"

___ " আংকেল শিশির বলল গাড়ির কি সমস্যা হইছে ও নিজে ঠিক করে দশ মিনিটের মধ্যেই আসতেছে তাই আমাদের নামিয়ে দিয়ে নিজেই গাড়ি নিয়ে চলে গেছে।"
___ " শিশির গাড়ি ড্রাইভ করছে কেন? ড্রাইভার কই? "

হাবিব সাহেবের এবার বেশ চিন্তা হতে লাগল। আবির তাড়াতাড়ি যেয়ে বিপ্লবকে ডেকে আনলো। ওদিকে বর এখনও কেন আসে নি তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছে। আবির আর বিপ্লব দুইজন মিলে হাবিব সাহেবকে বলল, যে ওরা বাসায় যেয়ে একবার দেখে আসুক। 

হাবিব সাহেব বললেন,উনি নিজেও যাবে ওদের সাথে। সবার অগোচরে তিনজন গাড়ি চালিয়ে বাসার দিকে রওনা দিল। বাসা কাছেই ছিল বাসায় যেয়েই দেখে সারাবাসার লাইট অন কাজের লোকটা বসে টিভি দেখছিল উনাদের বাসায় ঢুকতে দেখেই ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠলো। হাবিব সাহেব কাজের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " সুমন শিশির কি উপরে? "
___ " ভাইজান তো একটু আগে বাইর হইয়া গেল "।

ওর কথা শুনে সবাই হাঁ হয়ে গেল। একটু আগে শিশির বাসায় এসেছিল?  মানেটা কি! হাবিব সাহেব কিছু না বলেই শিশিরের রুমের দিকে ছুটলো। পিছু পিছু  আবির, বিপ্লব আর সুমনও আসলো। শিশিরের রুমটা এলোমেলো হয়ে আছে আলমারি থেকে কাপড় চোপড় বের করা হয়েছে। 

শিশিরের ল্যাপটপ টুকিটাকি কিছুই নেই। আবির পাশে তাকাতেই দেখতে পেল টেবিলের উপরে একটা কাগজ চাপা দেওয়া।  তাড়াতাড়ি কাগজটা উঠিয়ে এনে হাবিব সাহেবের হাতে দিল ও। হাবিব সাহেব কাগজটা খুলে কিছু অংশ পড়েই বুকের বা পাশে হাত দিয়ে যেন একটু হেলে গেলেন। 

পিছন থেকে আবির আর সুমন উনাকে ধরে ফেললেন। বিপ্লব তাড়াতাড়ি কাগজটা হাতে নিয়েই পড়া শুরু করল,
       আব্বু 
      এই চিঠাটা যখন তুমি পাবে তখন আমি তোমাদের          থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি। আব্বু আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি পারব না তোমাদের আর অন্য একটা মেয়ের সম্মান নষ্ট করতে। 

তাই বিয়েটা হওয়ার আগেই চলে গেলাম। জানি খুব কষ্ট পাবে। কখনও তো অবাধ্য হই নি তোমার কথার। আব্বু ডেনমার্কের একটা জবের অফার কনফার্ম করেছিলাম অনেক আগেই। কালকেই টিকিট হাতে পেয়েছি। 

আমার আজকে ফ্লাইট। ভাল থেকে আব্বু। যদি পারো আম্মু আর তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। 
  শিশির

চিঠিটা পড়ে বিপ্লব যেন থরথর করে কাঁপতে লাগল। এর মধ্যেই হাবিব সাহেবের ফোনটা বেজে উঠলো উনি ফোন হাতে নিয়ে দেখল জাহানারা কল দিয়েছে। 

কিছু না বলে কল রিসিভ করে বললেন যে উনি আসতেছেন। হাবিব সাহেবের মুখটা শক্ত হয়ে গেল৷ উনি মনে মনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিলেন। আবির আর বিপ্লব ভয়ের ঠেলায় কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারছে না উনাকে। আবার গাড়ি চালিয়ে গায়ের হলুদের মাঠে ফিরে এলেন। 

এসেই কিবরিয়া আর রাহেলাকে ডেকে এক কোনায় নিয়ে গেলেন। সাথে জাহানারা আর আবির বিপ্লব রইল। উনি কিবরিয়া সাহেব হাত শক্ত করে চেপে ধরে সব খুলে বললেন। জাহানারার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। ও যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না ওর ছেলেটা এমন করবে। 

কিবরিয়া সাহেব যেন পাথর হয়ে গেছে। সারা আত্মীয় স্বজনরা এসেছে এখন বিয়ে না হলে নাক কাটা যাবে উনার। আপায় উপায় না পেয়ে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিল দুই জনে। সুরের সাথে চমকের বিয়ে দেবে আজকে এবং এক্ষুনি। বেশ জোরালো কানা ঘুসা শুরু হয়ে গেলে সবার মাঝে বর আসে নাই। 

এত দেরি কেন হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বিন্দু যেন ঘামতে শুরু করেছে কেন জানিনা একটা খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে মন। এর একটু পরেই সুরকে ডেকে নিলেন কিবরিয়া সাহেব। সব খুলে বলতেই সুর যেন পাথর হয়ে গেল। হবে বোনের বিয়ে এখন সেটা বাদে হচ্ছে তার বিয়ে। 

কিন্তু হচ্ছেটা কি? সব শুনে চমকের চোখ থেকে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। কারো মুখেই কোন কথা নেই। কে যে কাকে স্বান্তনা দেবে সেটাই বুঝতে পারছে না। বিন্দু যখন শোনে শিশির এ বিয়ে করতে পারবে না ও ডেনমার্ক চলে যাচ্ছে আজকে রাতে। 

ওর যেন মনে হতে লাগল চিৎ কার করে ও কাঁদতে পারলে ওর হয় তো ভাল লাগবে। আচ্ছা ওর কি দোষ ছিল৷ বিয়েটা তো ফ্যামিলি থেকেই ঠিক করা হয়েছিল। আর প্রথম পুরুষ হিসাবে শিশিরকেই ও ভালবেসেছিল। শিশির কেন এমন করল। বিন্দু স্টেজ থেকেই উঠেই ছুটে চলল বাড়ির দিকে ওর পিছু পিছু রাহেলা আর কনাও গেল। বাড়িতে এসেই শাড়ি গয়না সব খুলে ছুড়ে মারল ও। 

কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলল। কনা রাহেলা বারেবার বলা স্বত্তেও আর দরজাই খুলল না ও। চমক আর সুরের কলমা কাবিন হওয়ার পরে যার যার বাড়িতে চলে গেল সবাই। কথা থাকল চমকের ইন্টার পরীক্ষার পরে ওকে তুলে দেওয়া হবে। 

সে রাতটা নির্ঘুম কাটলো দুটো পরিবারের প্রতিটি সদস্যের। পরের দিন সকালে উঠেই বিন্দু দরজা খুলে চলল ওর বাবার রুমে। দরজা মেলেই দেখলো কিবরিয়া সাহেব চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে আছেন। বিন্দু ওর বাবার পাশে যেয়ে দাঁড়াতেই উনি চোখ খুললেন। বিন্দুকে দাঁড়ানো দেখেই বললেন,
___ " কি রে মা কিছু বলবি? "
___ " বাবা একটা ওয়াদা দিতে পারবে আমাকে "।

বিন্দু ধরা গলায় বলল ওর বাবাকে। কিবরিয়া সাহেব ছলছল চোখে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন। বিন্দু তখন বলল,
___ " বাবা এত বড় হয়েছি কখন কোন  অন্যায় বা খারাপ কাজ করি নি শুধু তোমার সম্মানের কথা ভদবে আগেও কখনও করব না আমি নিজে তোমাকে ওয়াদা করলাম। কিন্তু বাবা আমাকে আর কখনও বিয়ের জন্য জোরাজোরি করবে না। যদি কখনো কাউকে আমার ভাল লাগে আমি নিজে এসে বলব তোমাকে।" 

এটুকু বলেই বিন্দু কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। কিবরিয়া সাহেবের মনে হচ্ছিল কেউ জানো তার কলিজাট কেটে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে উনি বললেন, 

____ "কখনও কেউ আর তোকে বিয়ের কথা বলবে না যদি কখনও তোর কোন ছেলে ভাল লাগে তার সাথেই তোর বিয়ে দেবো। সে হোক না কোন রিক্সাওয়ালা আমার আপত্তি থাকবে না"।

বিন্দু আর কিছু না বলেই সোজা ওর রুমের দিকে পা বাড়ালো। রাহেলা সব আড়াল থেকে শুনে চোখের পানি মুছলো। বুকটা যেন কে ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে ওর। নিজের চোখে মেয়ের এই অবস্থা যেনো ও সইতে পারছে না। কনাও মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে লাগল। কি থেকে কি হয়ে গেল। 

সময় আর নদীর স্রোত কখনও কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ঠিক তেমনিই ধীরে ধীরে তিনটি বছর কেটে গেছে ওদের সবার জীবন থেকে। তিনবছরে অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়ে গেছে। সুর আর চমকের ছোট্ট একটা মেয়ে আছে এখন। কনা ভার্সিটিতে পড়ছে। 

আর বিন্দু পড়ালেখা শেষ করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে উর্ধতন পদে চাকরি পেয়েছে। খুব ছোটাছুটির চাকরি প্রথমে রাহেলা গাঁইগুঁই করেছিল পরে বিন্দু আর ওর বাবার আগ্রহের সামনে তা আর ধোপে টেকে নি। প্রতিমাসেই দুই তিনবার ট্যুর থাকে দেশের বিভিন্ন জেলাতে। এবারও অফিস থেকে এসে বিন্দু রেডি হচ্ছে রাতেই রাঙ্গামাটি যাবে পর্যটন করপোরেশনের মোটেল অডিটে তাই খেয়ে রেডি হতেই সুর গাড়ি করে ওকে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে এলো। 

সারারাত জার্নি শেষে সকালে ক্লান্ত শরীরে রাঙামাটি নেমেই ও চলল মোটেলে। আগেও পুরাতন একটা মোটেল আছে বাট এবারের মোটেলটা অত্যাধুনিক আর খুব সুন্দর। সেটাই দেখতে এসেছে বিন্দু। এই সাত সকালে ম্যানেজার চলে এসেছে ওকে স্বাগতম জানাতে। 

সব ফর্মালিটি সেরে যখন বিন্দু তিনতালার ভি আই পি রুমে যাচ্ছেল হঠাৎ সামনের করিডোরে একটা মানুষকে দেখে ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর যেন মনে হতে লাগল পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে....... 
চলবে 
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(৫)

বিন্দুর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে লাগল। আজ থেকে তিন বছর আগে যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল সেই মানুষটি ওর সামনে দাঁড়িয়ে৷ পাশের ম্যানেজার অনেক খানি আগে হেঁটে চলে গিয়েছে বিন্দুকে রেখে খেয়ালই করে নি বিন্দু যে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটু সামনে যেয়েই আবার পেছনে ফিরে এলো ম্যানেজার। বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, 
___ " ম্যাম চলেন, হঠাৎ এভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন যে।"
___ " না কিছু না চলুন রুমে "।

বিন্দুর গলার স্বর শুনে শিশির ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়েই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না যে সামনে বিন্দু। বুকের মধ্যে হপারের মত শব্দ হতে থাকলো শিশিরের। বিন্দুও মাথা নিচু করে যেতে থাকল ওর পাশ থেকে। 

শিশিরের খুব ইচ্ছা করছিল বিন্দুর সাথে কথা,বলার। কিন্তু কোন মুখ নিয়ে কথা,বলবে ও বিন্দুর সাথে। সেই অধিকারের জলাঞ্জলি তো ও তিন বছর আগেই নিজের হাতে দিয়ে ফেলেছে। বিন্দুর আগের চেয়ে একটু স্বাস্থ বেড়েছে এতে ওকে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। 

পারপল কালারের একটা টিশার্টে উপরে এশ কালারের একটা হুডি পরেছে নিচে ব্লাক জিন্স বিন্দুকে পুরো দস্তুর ট্রাভেলার্সদের মত লাগছে। রুমে ঢুকেই বিন্দু তাড়াতাড়ি ডোর লক করে দিল। ম্যানেজার বাইরে থেকে বলল,

___ " ম্যাম যদি কিছু লাগে ইন্টারকমে কল দিয়েন "।
বেচারা আশ্চর্য হয়ে গেছে হঠাৎ কি এমন হল যে উনি এই টাইপের আচরন করতেছে। নিচে নামার সময় শিশির আটকালো ম্যানেজারকে, 
___" এক্সকিউজ মি! "
___ " ইয়েস স্যার "।

___ " আচ্ছা ওই ভদ্রমহিলা কে, না মানে স্বয়ং আপনি এসেছেন উনাকে নিয়ে রুম পর্যন্ত তাই জানার জন্য কিউরিয়াস হচ্ছি, নাথিং ইলস....
___ " ইটস ওকে স্যার, উনি আমাদের ডেপুটি চিফ অডিট অফিসার। তাই উনাকে এক্সট্রা কেয়ার করা আমাদের ডিউটি "।

শিশির কিছু না বলে মুচকি হাসি দিল। মেয়েটা তাহলে বিশাল একটা অফিসার। গত তিনদিন আগে বাংলাদেশ এসেছে শিশির। তিনটা বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জব পারপাস ঘুরেছে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল প্রতিনিয়ত নানান মেয়েদের সাথে পরিচয় হলেও বারেবার খুঁজে ফিরেছে বিন্দুকে। 

মেয়েটাকে এই জীবনে মাত্র দুই বার দেখেছে কিন্তু তারপরও যেন অন্য এক মায়া কাজ করেছে ওর জন্য। প্রতিটা রাতে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়েছে। বারেবার ভেবেছে বিয়ের রাতে পালিয়ে এসে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে ও ওর জীবনে। 

চমকের বিয়ে হয়েছে বিন্দুর ভাইয়ের সাথে সবই শুনেছে। চমকই বলেছে বিন্দু এখনও বিয়ে করে নি। কিন্তু বিন্দুর সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে সেটা যেন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে শিশিরের। দেশে আসার আগেই বিপ্লব আর আবিরকে নক করেছে ও। 

আবির এই মোটেলের রুম বুকিং করেছে ওর জন্য৷ ওরাও আসছে দুজনে ওদের ফ্যামিলি নিয়ে। আবির বিপ্লব দুজনেই বিয়ে করে ফেলেছে। ডেনমার্ক থাকলেও ওদের দুজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো শিশিরের। বাংলাদেশে আসার আগেই জানিয়েছিল যে ও আসছে। 

মায়ের সাথে কথা হয় শিশিরের মাঝে মাঝে কিন্তু বিগত তিনবছরে ওর বাবার সাথে এক সেকেন্ডের জন্যও কথা হয় নি। দহনের আগুনে পুড়ে পুড়ে আঙ্গার হয়েছে ও প্রতিটি মূহুর্তে। আর বিন্দুর খবর নিয়েছে বারেবারে চমকের কাছে থেকে। 

কিন্তু অজানা অভিমানে চমক শুধু হ্যাঁ না বলেই দায় সারা উত্তর দিয়ে চলেছে বারেবার। এসব ভাবতে ভাবতে আবার সিগারেট ধরালো ও।

বিন্দু চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। কান্না একদম নয় কান্না মানেই দূর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। সোজা উঠে চলল সামনের দিকে বেসিনের কাছে। চোখ মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়েই সোজা চলল শাওয়ার নিতে। গরম পানিতে টুপ টুপ করে ধুয়ে পড়ল ওর সমস্ত ক্লান্তি ইন্টারকমে কল দিল ও, কল রিসিভ করল ম্যানেজার, 
___ " হ্যালো, গুড মর্নিং "।
___ " সজীব সাজেব আমি বিন্দু "।

___ " ইয়েস ম্যাম, কি হেল্প করব ম্যাম। নাস্তা পাঠাবো রুমে "।

___ " না নাস্তা পাঠানো লাগবে না। আপনি নিচের রেস্টুরেন্টের একটা কোনের টেবিল রেডি করেন আমার জন্য আর ফাইল নিয়ে আসেন সব আমি ওখানে বসেই ব্রেকফাস্ট করব আর ফাইল দেখবো "। 
___ " জী ম্যাম, অবশ্যই জাষ্ট টেন মিনিট সময় দেন আমারে।"

বিন্দু শাওয়ার কোট বদলে অফ হোয়াইট কালারের শার্ট গায়ে দিল। সাথে ব্লু জিন্স আর ব্লাক কালারের লং সোয়েটার। মাথার চুল গুলো হেয়ার ড্রয়ার দিয়ে শুকিয়ে আঁচড়ে একদম উঁচু করে কাঠি দিয়ে আটকালো। 

হালকা লাইট মেকাপ করে ঠোঁটে লিপষ্টিকের ছোঁয়া দিল। ফুললি অফিসিয়াল লুক যাকে বলে। হাতে ছোট একটা পার্স এর মধ্যে ফোন আর ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। রেস্টুরেন্টে ঢুকেই দেখলো ম্যানেজারকে যা যা বলা হয়েছে সব রেডি করে দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের এক কোনায়। পর্যটন কর্পোরেশনের দুইটা মোটেল আছে রাঙ্গামাটিতে। 

পুরোনোটা একদম ঝুলন্ত সেতুর সংগে লাগোয়া আর নতুনটা আর একটু সামনে যাকে বলে পাঁচ মিনিট হাঁটার দূরত্বে। রাঙ্গামাটি শহরটা পুরোটাই পাহাড়ের উপরে। রাস্তা গুলোও সেই কিসমের কখনও এই উঁচু কখনও বা বিশাল ঢালু। 

এই শহরে কোন রিক্সা চলে না। আছে মটর সাইকেল আর সিএনজি। বিন্দুর টেবিল থেকে রাস্তা দেখা যায়। সকাল বেলার তারউপর আবার শীত অনেক। এখনও পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় নি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে পর্যটক দের আগমনও বেড়ে যায়। 

বিন্দু এসে টেবিলে বসেই ল্যাপটপ আর ফাইল খুলে নিয়ে কাজের মধ্যে ডুব দিল। আবির আর বিপ্লব যখন ওদের বউদের নিয়ে রাঙ্গামাটি এসে পৌঁছালো তখন সকাল প্রায় আটটা বেজে গেছে। নিনা আবিরের দিকে তাকিয়ে মুখ কুচকে বলল, 
___ " হায়রে আমার কোমর ফেটে গেছে রে বসতে বসতে। ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি আমি এক বসায় আইছি রে "।

____ " রাতে হোটেলে যখন থেমেছিল আমি কিন্তু ডেকেছিলাম তোমাকে তুমিই বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলে "।
আবির নিজের স্বপক্ষে যুক্তি দেওয়ার ট্রাই করল। নিনা ঝামটা দিয়ে বলল,
___ " থাক থাক আমার দোষ তোমার আর ধরতে হবে না। ঘুমাইছি সেটাও নাকি আমার দোষ "।
আবির হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙিতে বিপ্লবের দিকে তাকালো। বিপ্লব আবিরকে চোখের ইশারায় থামতে বলে শিশিরকে কল দিল, 
___ " দোস্ত তুই কই, "
বিপ্লব শিশিরকে জিজ্ঞেসা করল। শিশির উলটো প্রশ্ন করল, 
___ " তোরা কই "?

___ " হোটেলের নিচে আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়া তোরা আমি আসতেছি "।
নিচে নেমেই শিশির বিপ্লব আর আবিরকে জড়িয়ে ধরল। গত তিনটা বছর বন্ধুদের সাথে এক হতে পারে নি। আদর ভালবাসার পর্ব শেষ করে শিশির নিচ থেকে রুমের চাবি নিয়ে যার যার রুমে তাকে তাকে পাঠিয়ে দিল। বলল আধাঘন্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নামতে নাস্তা করেনি ও এক্কসাথে নাস্তা করবে। 

সবাই যার যার রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে একসাথে হোটেলের লবিতে দাঁড়ালো। নতুন মোটেলে রেস্টুরেন্ট নেই তাই সবাই চলল পুরাতন মোটেলের রেস্টুরেন্টে। শিশির ঢুকলো সবার পেছনে। মোটামুটি রেস্টুরেন্ট এর সব টেবিলই ভরা। 

ওরাও পাঁচ জন তাই এক কোনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ শিশিরের চোখে পড়ল চারটা চেয়ারের এক টেবিলে বিন্দু একা বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। ওর বুকের মধ্যে কেমন জানি খামচে ধরল বিন্দুকে দেখে। 

মেয়েটা আগের চেয়ে অনেক অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা বিন্দু তো একা ওর সাথে বসা যায় না? ঠিক তখনই আবির খেয়াল করল শিশির যেন মনোযোগ দিয়ে কি দেখছে। শিশিরের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই ওর বিন্দুর দিকে চোখ পড়ল। 

আবির কনুই দিয়ে খোঁচা বিপ্লবকে দেখালো। ওদের বউরা তখন খোশ গল্পে মশগুল। আবির ফিসফিসিয়ে শিশিরের কানের কাছে যেয়ে বলল,
___ " দোস্ত এটা তোর বোনের ননদ না? "
___ " হুম "।
শিশির মুখ অন্ধকার করে বলল৷ তখন বিপ্লব আবিরকে বলল,
___ " ওর এক্স হবু বউ আছিল সেটা কে বলবে? "
বিপ্লবের কথা শুনে শিশির আর কিছুই বলল না। তখন আবির বলল,

____ " সে যাই হোক চমকের ননদ মানে আমাদের বেয়াইন উনি থাকতে আমরা কেন দাঁড়িয়ে থাকবো।"
এই বলেই আবির গুটি গুটি পায়ে বিন্দুর টেবিলের কাছে যেয়ে দাঁড়ালো। বিন্দুর তখন সমস্ত মনোযোগ ফাইল আর ল্যাপটপে। আবির পাশে দাঁড়িয়ে খুক খুক করে কাশি দিল। বিন্দু ঘাড় ঘুরিয়েই আবিরের দিকে তাকিয়েই মুখে হাসি ফুটে উঠলো। ওর ভাইয়ের বিয়ের পরে আবির আর বিপ্লব নানার উপলক্ষে ওদের বাড়ি গিয়েছে তাই আবিরকে ও ভাল করেই চেনে। হেসে বলল,

___ " আরে আবির ভাইয়া আপনি এখানে? হোয়াট এ প্রেজেন্ট সারপ্রাইজ "।
___ " সারপ্রাইজ তো আমি না সারপ্রাইজ হল বিন্দু বিবি আপনার ভাবিও এসেছে "।
আবির হেসে উওর দিল।বিন্দু তখন বলল,
___ " কই ভাবি তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন"।

আবির তখন আঙুল তুলে ওদিকে ইশারা করতেই বিন্দুর চোখ পড়লো শিশিরের উপরে। মূহুর্তেই ওর হাসি যেন উড়ে গেল। আবির তাড়াতাড়ি সামাল দিতে সবাইকে ডাক দিল। সবাই আসতেই বিন্দু উঠে নিনা আর তুলিকে জড়িয়ে ধরল। তুলি হল বিপ্লবের বউ। 

বিপ্লব এসেও কথা বলল বিন্দুর সাথে। শিশিরের খুব ইচ্ছা হল বিন্দুর সাথে কথা বলার কিন্তু কি বলবে তা আর খুঁজে পেল না। বিন্দু হোটেল স্টাফদের ডেকে আরো দুটো চেয়ার আর নাস্তা দিতে বলল এখানে। 

সবাই যখন বসল কপালের ফেরে শিশির বসল একদম বিন্দুর পাশের চেয়ারে। বিন্দু আবারো টের পেল তিন বছর আগের সেই পাগল করা ঘ্রান। কথার ছলে আবির জিজ্ঞেস করল, 
___ " কি ব্যাপার বিন্দু তুমি হঠাৎ এখানে? "
___ " ভাইয়া অডিটে এসেছি। "
___ " আছো কয়দিন "।

এবার শিশির নড়েচড়ে বসে বিন্দুর মুখের দিকে তাকালো। বিন্দু হেসে বলল,
___ " এসেছি তো এক সপ্তাহের জন্য, মনে হয় কাজ দুদিন বাদেই শেষ হয়ে যাবে তখন ব্যাক করব ঢাকাতে "।

নিনা তখন হা হা করে উঠে বলল,
___ " সেটা তো হবে না ম্যাডাম, কাজ শেষ করে আমাদের সাথে ঘুরতে হবে।"
___ " না ভাবি অন্য কখনও "।

___ " অন্য সন্য পরে দেখিও আমাদের তুমি থাকছো মানে থাকছো।"
তুলি জোর দিয়ে বলল। বিন্দু মুচকি একটা হাসি দিল। তখন বিপ্লব চেঁচিয়ে উঠে বলল,
___ " ও লাড়কি হাসি তো ফাঁছি "।

সবাই হাহাহা করে হেসে উঠলো। এমন সময় বিন্দু হাত বাড়ালো পানির গ্লাস নিতে। আর শিশির ব্রেড নিতে বিন্দুর আঙুলে আলতো ছোঁয়া লাগল শিশিরের। বিন্দু যেন থর থর করে কেঁপে উঠলো। সেই শপিং মলের লিফটের কথা মনে পড়ল ওর। আর শিশির অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল বিন্দুর দিকে.......
চলবে 
মারিয়া আফরিন নুপুর-

শিশিরের বিন্দু-গল্পের-পার্ট-(৬)

বিন্দুর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে লাগল। আজ থেকে তিন বছর আগে যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল সেই মানুষটি ওর সামনে দাঁড়িয়ে৷ পাশের ম্যানেজার অনেক খানি আগে হেঁটে চলে গিয়েছে বিন্দুকে রেখে খেয়ালই করে নি বিন্দু যে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটু সামনে যেয়েই আবার পেছনে ফিরে এলো ম্যানেজার। বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, 

___ " ম্যাম চলেন, হঠাৎ এভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন যে।"
___ " না কিছু না চলুন রুমে "।

বিন্দুর গলার স্বর শুনে শিশির ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়েই সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না যে সামনে বিন্দু। বুকের মধ্যে হপারের মত শব্দ হতে থাকলো শিশিরের। বিন্দুও মাথা নিচু করে যেতে থাকল ওর পাশ থেকে। 

শিশিরের খুব ইচ্ছা করছিল বিন্দুর সাথে কথা,বলার। কিন্তু কোন মুখ নিয়ে কথা,বলবে ও বিন্দুর সাথে। সেই অধিকারের জলাঞ্জলি তো ও তিন বছর আগেই নিজের হাতে দিয়ে ফেলেছে। বিন্দুর আগের চেয়ে একটু স্বাস্থ বেড়েছে এতে ওকে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। 

পারপল কালারের একটা টিশার্টে উপরে এশ কালারের একটা হুডি পরেছে নিচে ব্লাক জিন্স বিন্দুকে পুরো দস্তুর ট্রাভেলার্সদের মত লাগছে। রুমে ঢুকেই বিন্দু তাড়াতাড়ি ডোর লক করে দিল। ম্যানেজার বাইরে থেকে বলল,
___ " ম্যাম যদি কিছু লাগে ইন্টারকমে কল দিয়েন "।

বেচারা আশ্চর্য হয়ে গেছে হঠাৎ কি এমন হল যে উনি এই টাইপের আচরন করতেছে। নিচে নামার সময় শিশির আটকালো ম্যানেজারকে, 
___" এক্সকিউজ মি! "
___ " ইয়েস স্যার "।

___ " আচ্ছা ওই ভদ্রমহিলা কে, না মানে স্বয়ং আপনি এসেছেন উনাকে নিয়ে রুম পর্যন্ত তাই জানার জন্য কিউরিয়াস হচ্ছি, নাথিং ইলস....
___ " ইটস ওকে স্যার, উনি আমাদের ডেপুটি চিফ অডিট অফিসার। তাই উনাকে এক্সট্রা কেয়ার করা আমাদের ডিউটি "।

শিশির কিছু না বলে মুচকি হাসি দিল। মেয়েটা তাহলে বিশাল একটা অফিসার। গত তিনদিন আগে বাংলাদেশ এসেছে শিশির। তিনটা বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জব পারপাস ঘুরেছে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল প্রতিনিয়ত নানান মেয়েদের সাথে পরিচয় হলেও বারেবার খুঁজে ফিরেছে বিন্দুকে। 

মেয়েটাকে এই জীবনে মাত্র দুই বার দেখেছে কিন্তু তারপরও যেন অন্য এক মায়া কাজ করেছে ওর জন্য। প্রতিটা রাতে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে পুড়িয়েছে। বারেবার ভেবেছে বিয়ের রাতে পালিয়ে এসে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে ও ওর জীবনে। 

চমকের বিয়ে হয়েছে বিন্দুর ভাইয়ের সাথে সবই শুনেছে। চমকই বলেছে বিন্দু এখনও বিয়ে করে নি। কিন্তু বিন্দুর সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে সেটা যেন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে শিশিরের। দেশে আসার আগেই বিপ্লব আর আবিরকে নক করেছে ও। আবির এই মোটেলের রুম বুকিং করেছে ওর জন্য৷ ওরাও আসছে দুজনে ওদের ফ্যামিলি নিয়ে। 

আবির বিপ্লব দুজনেই বিয়ে করে ফেলেছে। ডেনমার্ক থাকলেও ওদের দুজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো শিশিরের। বাংলাদেশে আসার আগেই জানিয়েছিল যে ও আসছে। মায়ের সাথে কথা হয় শিশিরের মাঝে মাঝে কিন্তু বিগত তিনবছরে ওর বাবার সাথে এক সেকেন্ডের জন্যও কথা হয় নি। 

দহনের আগুনে পুড়ে পুড়ে আঙ্গার হয়েছে ও প্রতিটি মূহুর্তে। আর বিন্দুর খবর নিয়েছে বারেবারে চমকের কাছে থেকে। কিন্তু অজানা অভিমানে চমক শুধু হ্যাঁ না বলেই দায় সারা উত্তর দিয়ে চলেছে বারেবার। এসব ভাবতে ভাবতে আবার সিগারেট ধরালো ও।

বিন্দু চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। কান্না একদম নয় কান্না মানেই দূর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। সোজা উঠে চলল সামনের দিকে বেসিনের কাছে। চোখ মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়েই সোজা চলল শাওয়ার নিতে। গরম পানিতে টুপ টুপ করে ধুয়ে পড়ল ওর সমস্ত ক্লান্তি ইন্টারকমে কল দিল ও, কল রিসিভ করল ম্যানেজার, 
___ " হ্যালো, গুড মর্নিং "।
___ " সজীব সাজেব আমি বিন্দু "।
___ " ইয়েস ম্যাম, কি হেল্প করব ম্যাম। নাস্তা পাঠাবো রুমে "।
___ " না নাস্তা পাঠানো লাগবে না। আপনি নিচের রেস্টুরেন্টের একটা কোনের টেবিল রেডি করেন আমার জন্য আর ফাইল নিয়ে আসেন সব আমি ওখানে বসেই ব্রেকফাস্ট করব আর ফাইল দেখবো "। 

___ " জী ম্যাম, অবশ্যই জাষ্ট টেন মিনিট সময় দেন আমারে।"
বিন্দু শাওয়ার কোট বদলে অফ হোয়াইট কালারের শার্ট গায়ে দিল। সাথে ব্লু জিন্স আর ব্লাক কালারের লং সোয়েটার। মাথার চুল গুলো হেয়ার ড্রয়ার দিয়ে শুকিয়ে আঁচড়ে একদম উঁচু করে কাঠি দিয়ে আটকালো। 

হালকা লাইট মেকাপ করে ঠোঁটে লিপষ্টিকের ছোঁয়া দিল। ফুললি অফিসিয়াল লুক যাকে বলে। হাতে ছোট একটা পার্স এর মধ্যে ফোন আর ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। রেস্টুরেন্টে ঢুকেই দেখলো ম্যানেজারকে যা যা বলা হয়েছে সব রেডি করে দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের এক কোনায়। পর্যটন কর্পোরেশনের দুইটা মোটেল আছে রাঙ্গামাটিতে। 

পুরোনোটা একদম ঝুলন্ত সেতুর সংগে লাগোয়া আর নতুনটা আর একটু সামনে যাকে বলে পাঁচ মিনিট হাঁটার দূরত্বে। রাঙ্গামাটি শহরটা পুরোটাই পাহাড়ের উপরে। রাস্তা গুলোও সেই কিসমের কখনও এই উঁচু কখনও বা বিশাল ঢালু। এই শহরে কোন রিক্সা চলে না। আছে মটর সাইকেল আর সিএনজি। বিন্দুর টেবিল থেকে রাস্তা দেখা যায়। সকাল বেলার তারউপর আবার শীত অনেক। এখনও পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় নি। 

বেলা বাড়ার সাথে সাথে পর্যটক দের আগমনও বেড়ে যায়। বিন্দু এসে টেবিলে বসেই ল্যাপটপ আর ফাইল খুলে নিয়ে কাজের মধ্যে ডুব দিল। আবির আর বিপ্লব যখন ওদের বউদের নিয়ে রাঙ্গামাটি এসে পৌঁছালো তখন সকাল প্রায় আটটা বেজে গেছে। নিনা আবিরের দিকে তাকিয়ে মুখ কুচকে বলল, 

___ " হায়রে আমার কোমর ফেটে গেছে রে বসতে বসতে। ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি আমি এক বসায় আইছি রে "।
____ " রাতে হোটেলে যখন থেমেছিল আমি কিন্তু ডেকেছিলাম তোমাকে তুমিই বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলে "।
আবির নিজের স্বপক্ষে যুক্তি দেওয়ার ট্রাই করল। নিনা ঝামটা দিয়ে বলল,

___ " থাক থাক আমার দোষ তোমার আর ধরতে হবে না। ঘুমাইছি সেটাও নাকি আমার দোষ "।
আবির হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙিতে বিপ্লবের দিকে তাকালো। বিপ্লব আবিরকে চোখের ইশারায় থামতে বলে শিশিরকে কল দিল, 

___ " দোস্ত তুই কই, "
বিপ্লব শিশিরকে জিজ্ঞেসা করল। শিশির উলটো প্রশ্ন করল, 
___ " তোরা কই "?
___ " হোটেলের নিচে আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়া তোরা আমি আসতেছি "।

নিচে নেমেই শিশির বিপ্লব আর আবিরকে জড়িয়ে ধরল। গত তিনটা বছর বন্ধুদের সাথে এক হতে পারে নি। আদর ভালবাসার পর্ব শেষ করে শিশির নিচ থেকে রুমের চাবি নিয়ে যার যার রুমে তাকে তাকে পাঠিয়ে দিল। বলল আধাঘন্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নামতে নাস্তা করেনি ও এক্কসাথে নাস্তা করবে। সবাই যার যার রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে একসাথে হোটেলের লবিতে দাঁড়ালো। 

নতুন মোটেলে রেস্টুরেন্ট নেই তাই সবাই চলল পুরাতন মোটেলের রেস্টুরেন্টে। শিশির ঢুকলো সবার পেছনে। মোটামুটি রেস্টুরেন্ট এর সব টেবিলই ভরা। ওরাও পাঁচ জন তাই এক কোনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ শিশিরের চোখে পড়ল চারটা চেয়ারের এক টেবিলে বিন্দু একা বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। ওর বুকের মধ্যে কেমন জানি খামচে ধরল বিন্দুকে দেখে। 

মেয়েটা আগের চেয়ে অনেক অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা বিন্দু তো একা ওর সাথে বসা যায় না? ঠিক তখনই আবির খেয়াল করল শিশির যেন মনোযোগ দিয়ে কি দেখছে। শিশিরের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই ওর বিন্দুর দিকে চোখ পড়ল। আবির কনুই দিয়ে খোঁচা বিপ্লবকে দেখালো। ওদের বউরা তখন খোশ গল্পে মশগুল। আবির ফিসফিসিয়ে শিশিরের কানের কাছে যেয়ে বলল,
___ " দোস্ত এটা তোর বোনের ননদ না? "
___ " হুম "।

শিশির মুখ অন্ধকার করে বলল৷ তখন বিপ্লব আবিরকে বলল,
___ " ওর এক্স হবু বউ আছিল সেটা কে বলবে? "
বিপ্লবের কথা শুনে শিশির আর কিছুই বলল না। তখন আবির বলল,
____ " সে যাই হোক চমকের ননদ মানে আমাদের বেয়াইন উনি থাকতে আমরা কেন দাঁড়িয়ে থাকবো।"

এই বলেই আবির গুটি গুটি পায়ে বিন্দুর টেবিলের কাছে যেয়ে দাঁড়ালো। বিন্দুর তখন সমস্ত মনোযোগ ফাইল আর ল্যাপটপে। আবির পাশে দাঁড়িয়ে খুক খুক করে কাশি দিল। বিন্দু ঘাড় ঘুরিয়েই আবিরের দিকে তাকিয়েই মুখে হাসি ফুটে উঠলো। ওর ভাইয়ের বিয়ের পরে আবির আর বিপ্লব নানার উপলক্ষে ওদের বাড়ি গিয়েছে তাই আবিরকে ও ভাল করেই চেনে। হেসে বলল,

___ " আরে আবির ভাইয়া আপনি এখানে? হোয়াট এ প্রেজেন্ট সারপ্রাইজ "।
___ " সারপ্রাইজ তো আমি না সারপ্রাইজ হল বিন্দু বিবি আপনার ভাবিও এসেছে "।
আবির হেসে উওর দিল।বিন্দু তখন বলল,
___ " কই ভাবি তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন"।

আবির তখন আঙুল তুলে ওদিকে ইশারা করতেই বিন্দুর চোখ পড়লো শিশিরের উপরে। মূহুর্তেই ওর হাসি যেন উড়ে গেল। আবির তাড়াতাড়ি সামাল দিতে সবাইকে ডাক দিল। সবাই আসতেই বিন্দু উঠে নিনা আর তুলিকে জড়িয়ে ধরল। তুলি হল বিপ্লবের বউ। বিপ্লব এসেও কথা বলল বিন্দুর সাথে। শিশিরের খুব ইচ্ছা হল বিন্দুর সাথে কথা বলার কিন্তু কি বলবে তা আর খুঁজে পেল না। 

বিন্দু হোটেল স্টাফদের ডেকে আরো দুটো চেয়ার আর নাস্তা দিতে বলল এখানে। সবাই যখন বসল কপালের ফেরে শিশির বসল একদম বিন্দুর পাশের চেয়ারে। বিন্দু আবারো টের পেল তিন বছর আগের সেই পাগল করা ঘ্রান। কথার ছলে আবির জিজ্ঞেস করল, 

___ " কি ব্যাপার বিন্দু তুমি হঠাৎ এখানে? "
___ " ভাইয়া অডিটে এসেছি। "
___ " আছো কয়দিন "।

এবার শিশির নড়েচড়ে বসে বিন্দুর মুখের দিকে তাকালো। বিন্দু হেসে বলল,
___ " এসেছি তো এক সপ্তাহের জন্য, মনে হয় কাজ দুদিন বাদেই শেষ হয়ে যাবে তখন ব্যাক করব ঢাকাতে "।
নিনা তখন হা হা করে উঠে বলল,
___ " সেটা তো হবে না ম্যাডাম, কাজ শেষ করে আমাদের সাথে ঘুরতে হবে।"
___ " না ভাবি অন্য কখনও "।

___ " অন্য সন্য পরে দেখিও আমাদের তুমি থাকছো মানে থাকছো।"
তুলি জোর দিয়ে বলল। বিন্দু মুচকি একটা হাসি দিল। তখন বিপ্লব চেঁচিয়ে উঠে বলল,
___ " ও লাড়কি হাসি তো ফাঁছি "।

সবাই হাহাহা করে হেসে উঠলো। এমন সময় বিন্দু হাত বাড়ালো পানির গ্লাস নিতে। আর শিশির ব্রেড নিতে বিন্দুর আঙুলে আলতো ছোঁয়া লাগল শিশিরের। বিন্দু যেন থর থর করে কেঁপে উঠলো। সেই শপিং মলের লিফটের কথা মনে পড়ল ওর। আর শিশির অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল বিন্দুর দিকে.......
চলবে 
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(৭)

বিন্দু চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালো একরাশ অভিমান নিয়ে। এই মানুষটাই একদিন সবার সামনে তাকে বিনা অপরাধে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। 

বিন্দু তাড়াতাড়ি চোখের পানি আটকালো। আড্ডায় আড্ডায় খাওয়া শেষে করে আবির __নিনা, বিপ্লব __ তুলি, শিশির ওদের হোটেলে ফিরে গেল। বিন্দু রয়ে গেল কারণ ওর কাজ এখনও শেষ হয় নি।
 
হোটেলে ফিরেই নিনা আর তুলিকে রুমে পাঠিয়ে আবির আর বিপ্লব এলো শিশিরের রুমে। শিশিরের রুমে ঢুকেই দেখলো শিশির ব্যালকুনিতে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবির পিছন থেকে এসে শিশিরের ঘাড়ে হাত দিতেই এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ও।  ভেতরে এসে বসতেই বিপ্লব বলল,
___" কি রে বিন্দুকে দেখে খুব খারাপ লেগেছে "।

___ " প্রচন্ড অনুশোচনা হচ্ছে রে দোস্ত। মেয়েটাকে এভাবে ফেলে না রেখে গেলেও পারতাম "।
শিশির অবনত মস্তকে বলল। আবির পাশ ঘেঁসে বসতে বসতে বলল,
___ " আজকে তো কথা বলতে পারতি ওর সাথে তাই না "।

___ " কোন মুখে কথা বলব বল, এত বড় একটা অপরাধ করে কি আবারও তার সাথে কি ভাবে কথা বলব আমি?  আমি যে শুধু ওর জন্যই ফিরে এসেছি "।
___ " এই কথাটা বিন্দুকে বলতে হবে তোর ওকে বুঝা যে তুই ভুল করেছিস। এটা তোকে পুড়িয়েছে বারেবার।"
আবির শিশিরের চোখে চোখ রেখে বলল। শিশির কিছু না বলে মাথা ঝাকালো। টুকটাক কথাবার্তার পরে ওরা যার যার রুমে চলে গেল। সারারাত জার্ণি করে এসেছে ওরা তাই একটা ঘুমের দরকার ওদের। 

শিশির সিগারেট ধরিয়ে আবার এসে বসল বেলকুনিতে। দুপুর হয়ে আসছে রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু দেখতে শয়ে হয়ে লোক আসছে। 
কত কিসিমের লোক যে আসছে আর শিশির বসে বসে দেখছে। যারা পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে থাকে তাদের সেতুতে যেতে টাকা লাগে না। কিন্তু অন্যদের দশটাকা করে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। 

কাপ্তাই হ্রদের উপরে ঝুলন্ত বিজ্রটা বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু মজার কথা হল শিশির এখনও পর্যন্ত যায় ওখানে। হঠাৎ শিশির দেখলো বিন্দু আসছে সাথে ওই ম্যানেজারটা। 

শিশির মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে করেই হোক বিন্দুর সাথে কথা বলবে। যেই ভাবা সেই কাজ,  শিশির তাড়াতাড়ি দরজার কাছে যেয়ে দাঁড়ালো। বিন্দু আজকে প্রচুর টায়ার্ড সারারাত জার্ণি করে এসেছে কিন্তু একটুও রেষ্ট না করে টানা কাজ করেছে এতক্ষন। ম্যানেজারকে বলল,

___ " সজীব শোনেন আমার যে গেস্টরা আছেন তাদের এক্সট্রা কেয়ার নেবেন। দুপুরে কে কি খাবে সেটার খেয়াল রাখাবেন। "
___ " জী ম্যাম অবশ্যই "।

___ " আর হ্যাঁ আজকে আর কোন কাজ করব না। যে কাজ আছে মোটামুটি একদিনেই শেষ হয়ে যাবে। আমি আছি এই সপ্তাহটা। যদি প্রয়োজন পড়ে তো নক দেবেন।"
___ " জি ম্যাম "।

এ কথা বলেই ম্যানেজার চলে গেল। বিন্দুর অবাক লাগে এই ছেলেটাকে দেখে জি ম্যাম ছাড়া আর কিছুই আসে না মুখ দিয়ে, আজব কাহিনী। শিশির যখন দেখলো লিফট চার তলায় উঠে এলো ও সাথে সাথে দরজা খুলে এক পাশে দাঁড়ালো। 
বিন্দু ব্যাগ থেকে চাবি খুঁজতে খুঁজতে আসছিল তাই আর খেয়াল করে নি যে সামনে শিশির দাঁড়ানো। হুট করে একদম বিন্দুর সামনে এসে দাঁড়াতেই ও শিশিরের বুকের সাথে ধাক্কা খেল। 

শিশির তাড়াতাড়ি করে ওকে ধরে ফেলল যাতে ও পড়ে না যায়। বিন্দু নিজেকে সামলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। 
তখনও শিশির বিন্দুকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বিন্দু বরাবর শিশিরের চোখের দিকে তাকালো। যে কোন মূহুর্তে ওই মেঘ বর্ষণে রুপ নিতে পারে। শিশির কোমল স্বরে বলে উঠলো,

___ " কেমন আছো বিন্দু "?
___ " এই কথাটা তিনবছর আগে বললে হয়ত উওর দিতাম কিন্তু এখন উওর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না "।
চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে বলা কথাগুলো হয়ত বুকে একটু বেশিই বেঁধে। শিশির মাথা নিচু করে রইল।আসলে ওর যে বলার কিছুই নেই বিন্দুকে। শিশির মরিয়া হয়ে বলল,

___ " বিন্দু প্লীজ কিছু কথা শুনবে, প্লীজ......? "
___ " এটা আমার ওয়ার্কিং প্লেস। কেউ দেখে ফেললে ঝামেলা। আর আমার এখন কথা বলা বা শোনার মুড কোনটাই নেই জাষ্ট লিভ মি "।
কথা গুলো বলে বিন্দু নিজেই শিশিরের হাত সরিয়ে চলল রুমের দিকে। পিছন ফিরলে হয়ত দেখতো শিশিরের  চোখ বেয়ে শিশিরের বিন্দুর মত পানি টপটপ করে পড়ছে। 

রুমে ঢুকেই বিন্দু বিছানার উপরে শুয়ে বালিশে মুখ গুজে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বারেবার মনে হচ্ছিল ওই মানুষটার বুকে একটু খানি মাথা দিয়ে কাঁদতে পারলে হয়ত শান্তি লাগত। প্রথম প্রেম ছিল ওর। 

কোন দোষে ওরে এত বড় শাস্তি দিয়েছিল শিশির। চোখ মুছে উঠে বসল বিন্দু,  ও শাস্তি দেবে শিশিরকে। কঠিন শাস্তি।
বিন্দু চেঞ্জ করে না খেয়েই পর্দা টেনে রুম অন্ধকার করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলো নিমেষেই। হঠাৎ বিন্দুর খেয়াল হল দরজায় কে যেন নক করছে। বেশ জোরে সোরেই বিন্দু চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলেই দেখলো নিনা আর  তুলি দাঁড়ানো। 

একটু দূরে আবির বিপ্লব আর শিশির দাঁড়িয়ে কথা বলছে। নিনা বিন্দুকে দেখেই মুখে হাত দিয়ে ফেলল। তুলিও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। আর বাকি তিনজন কথা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে ঘুরে গেল।
 
বিন্দু বুঝল না হঠাৎ এমন করার কারণটা কি? হঠাৎ বিন্দুর চোখ পড়ল ওর নিজের দিকে। স্লিভলেস টিশার্ট আর শর্টস পরে ঘুমিয়েছিল ওটা পরেই চলে এসেছে সবার সামনে। দরজা খোলা রেখেই ও ছুটলো রুমের ভেতরে। 

নিনা আর তুলি মুখ চেপে হাসতে হাসতে রুমে ঢুকলো। একটু পরে বিন্দু একবারে গোসল করে ফিরোজা কালারের একটা কামিজ আর সাদা পাজামা ওড়না পরে বের হল ওয়াশরুম থেকে। ততক্ষনে শিশির আবির আর বিপ্লবও এসেছে রুমের মধ্যে। 

সদ্য গোসল করা মেয়েদের নাকি এমনিতেই অপরুপা লাগে আর বিন্দুকে তো অসাধারণ লাগতেছে। 
খোলা বড় চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়তেছে। ভেজা ভ্রু ভেজা ঠোঁট শিশির যেন চোখই ফেরাতে পারছে না। মনে হচ্ছে বিন্দুকে ওর এক্ষুনি চাই।
 
বিন্দু চুলে টাওয়াল জড়িয়ে বসল বিছানায় তুলি আর নিনার পাশে। আবির বলল বিন্দুকে,
___ " ম্যাম কালকে সারাদিন ঘুরবো ফ্রি থাকবেন "।

___ " ভাইয়া যাকে বলে জবরদস্তি ট্রিট দেওয়া আপনারা তাই দিচ্ছেন আমাকে।  "
বিন্দু হাসতে হাসতে বলল। তখন নিনা ঠোঁট উল্টয়ে বিন্দুকে বলল,
___ " সে তুমি যাই ভাব না কেন যেতে তো হবেই। আচ্ছা তা যাব কই আমরা "।

___ " রাঙামাটিতে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির আছে। ওখানে কালকে সারাদিন ঘুরতে পারি। কালকে আদিবাসীদের অনেক বড় উৎসব চিবর দান আছে শুনেছি। "
___ " তাহলে কালকে সারাদিন ওখানে ঘুরবো আমরা "।
নিনা আনন্দের সাথে বলল। ওমনি আবির বলে উঠলো,
___ "  আচ্ছা চিবর মানে তো কাপড় প্রদান তাই না "।

বিন্দু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। তখন আবির বলল,
___ " কাপড়ের সাথে বউ দান করার কোন ওয়ে নাই৷"
আবিরের কথা শুনে ঘরের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। একথা শুনে নিনা রেগেমেগে বলল,
___ " কি তুমি আমারে দান করতে চাও "।
আবির তাড়াতাড়ি ঢোক গিলে বলল,

___ " জান আমি কখন বললাম যে তোমারে দান করব। পাগল নাকি তুমি? ও তো বিপ্লব জিজ্ঞেস করতেছিল আমার কাছে। তাই জানার জন্য বিন্দুরে জিজ্ঞেস করলাম আর কি! "

এবার আবিরের কথা শুনে তুলি চোখ গরম করে বিপ্লবের দিকে তাকালো। বিপ্লব এবার মেজাজ গরম করে বলল,
___ " হারামী নিজে মরবে মরবেই আবার আমারেও সাথে করে নিয়ে মরবে।"

এমন দুষ্ট মিষ্ট খুনসুটি গুলো বিন্দু হাসতে হাসতে দেখছিল আর শিশির দেখছিল অপলক নয়নে বিন্দুকে। মেয়েটা হাসলে যে এত এত সুন্দর লাগে সেটা তো কখনও জানত না শিশির।

সবার গল্প শেষে ওরা চলল খেতে। যাওয়ার আগেই বিন্দু ফোন দিয়ে বলার কারণে যেয়ে বসতেই খাবার এসে পড়ল। রুপচাঁদা ফ্রাই, কালাভূনা,ডাল,কোরাল মাছ আর ডিম সাথে শ্বেত শুভ্র সাদা ভাত। খাওয়া শেষে সবাই চলল মোটেলের অপজিটে আর্মিদের গিফট শপে। সবাই গেলেও বিন্দু ফোন নিয়ে বসলো শান বাদাঁনো এক গাছের নিচে। 

তারা ভরা আকাশ আর শীতের মধ্যে বেশ ভালই লাগছে ওর। শপের ভিতর থেকে সবার হাসির শব্দ আসছে। ওর ভালই লাগছে এদের সান্নিধ্য।  কিন্তু শিশিরকে যখনই দেখে মনে হয় কেউ যেন বুকের খুব নরম জায়গায় ছুরির খোঁচা দিচ্ছে। 

বিন্দু ফোনে মনোযোগ দিল। এমন সময় টের পেল ওদের শূন্য উঠে যাচ্ছে। পাশ ফিরে দেখলো শিশির ওকে আড়কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে আবির নিনা, তুলি বিপ্লব সবাই হৈহৈ করে উঠলো। বিন্দু চোখ বড় বড় করে বলল,

___ " এটা কি ধরনের কাজ কারবার। "
___ " পাগল ধরনের কাজ কারবার।"

শিশির নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল। বিন্দু দাঁতে দাঁত পিষে বলল........
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(৮)

বিন্দু দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
___ " ফাজলামির একটা লিমিট আছে "।
___ " কোলে নেওয়াটা কি ফাজলামি?? "
শিশির হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করল। বিন্দু এবার শিশিরের মুখের দিকে তাকালো। এতদম শিশিরের চোখের দিকে তাকালো। 
 
শিশির এবার বিন্দুকে আরো কাছে নিয়ে এসে হাঁটতে লাগল। বিন্দু চোখ ফিরিয়ে নিল কেন জানি না। ওই চোখের দিকে তাকালে হয়ত আবারো প্রেমে পড়ে যাবে। শিশির ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
___ " কেমন আছো বিন্দু "।
 
এবার বিন্দুর অভিমানের জল চোখ থেকে নিচে গড়ালো। টপটপ করে পানি পড়তে লাগল চোখ দিয়ে। কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল,
___ " তিন বছর আগে এই কথাটা ভাবলে হয়ত আমাকে ছেড়ে যেতেন না "।
 
শিশির কিছু না বলে বিন্দুকে কোলে নিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছু সময় পরে একটু দম নিয়ে আবার বিন্দু দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " আজকের রাতটুকু আমাকে দেবে আমি কিছু কথা বলব তোমার সাথে।"
বিন্দু মুখ ঘুরিয়ে বলল,
___ " না একদম না। আমার কাছে কোন সময় নেই আপনার জন্য।"
 
___ " বিন্দু আমি জোর করে সময় আদায় করে নিতে পারি। কিন্তু সেটা চাচ্ছি না। প্লীজ একটু সময় দেও। "
বিন্দু কিছু না বলে মুখ নিচু করে রইল। হোটেলের সামনে এসে শিশির বিন্দুকে নামিয়ে দিল। পেছনে দেখলো সবাই হেঁটে হেঁটে হাসাহাসি করতে করতে আসছে। 
 
বিন্দুকে নামিয়ে দিতেই ও হনহন করে ভেতরে হেঁটে চলে গেল একবারো পিছু ফিরে তাকালো না। পিছন থেকে আবির এসে শিশিরের পেটে গুঁতো দিয়ে বলল,
____ " কি রে হিরো কেমন লাগল হিরোইনরে কোলে নিয়ে। "
শিশির কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল।
 
কারন ওর মনে মধ্যে ঘুরছে বিন্দুকে সব বুঝিয়ে বলার পরে বিন্দু বুঝবে তো ওর সিচুয়েশনটা। বিপ্লব তখন আবিরের প্রশ্নের উওর দিল ঠেস মেরে,
 
___ " এত দিন পরে এত কাছাকাছি দুইজনে তারপরও তুই জিজ্ঞেস করিস কেমন লাগে? "
___ " আসলেই আমার মাথায় বুদ্ধি কম রে "।
আবির মাথায় টোঁকা দিয়ে বলল। শিশির গম্ভীর স্বরে বলল,
 
___ " অনেক রাত হয়েছে যার যার রুমে যেয়ে শুয়ে পড়।"
___ " আসছি ঘুরতে তাও তুই এত তাড়াতাড়ি ঘুম পড়ায়ে দেওয়ার প্লান করতাছত "।
 
আবির মুখ ঝুলিয়ে বলল। বিপ্লব শিশিরের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে চুপ রইল। সবাই লিফটে উঠে যার যার রুমে চলে গেল। 
 
শিশির ওর রুমে বসে একের পরে এক সিগারেট ধরাতেই লাগল। মনে হচ্ছে এই ধোঁয়ার সাথে যেন মিশে যাচ্ছে সব না বলা কষ্ট গুলো। 
এলোমেলো লাগছে শিশিরকে বারে বার। এমন করে কতক্ষন যে ছিল সেটা শিশির জানে না। ঘোর ভাঙল দরজার শব্দে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় রাত বারোটার কাছাকাছি। 
 
এতক্ষন হয়ে গেছে ওর তো যাওয়ার কথা বিন্দুর কাছে। ইসস মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে হয়ত। কেমন যে লাগছে। কিন্তু এত রাতে কে এলো। শিশির তাড়াতাড়ি যেয়ে দরজা খুলেই হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। 
 
এলোমেলো কাপড় চোপড় মাথায় চুলগুলোও এলোমেলো প্রচন্ড উত্তরা বাতাসে উড়ছে চুল গুলো। এই শীতের মাঝে পাতলা একটা টিশার্ট আর শর্টস পরে দাঁড়ানো ওর দরজার সামনে বিন্দু। 
 
শিশির যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। শিশির বিন্দুকে টেনে রুমের ভেতরে এনে দরজা লাগিয়ে দিল। লাইটের আলোতে দেখলো বিন্দুর চোখ জোড়া টকটকে লাল। 
প্রচুর কেঁদেছে হয়ত। 
 
বিন্দু হঠাৎ শিশিরের বুকে মাথা দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বারেবারে বলতে লাগল,
___ " আমাকে কেন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন? আমার কি দোষ ছিল বলতে পারে? 
 
আমি তো আপনাকে কিছুই করি নি তাহলে আমাকে এত এত কঠিন শাস্তি কেন দিয়ে গেলেন আপনি? "
 
বিন্দুর প্রতিটি কথা যেন শিশিরের বুকে বিঁধতে লাগল ছুরির মত। বিন্দুর চোখের পানিতে ভেসে যাচ্ছে শিশিরের বুক। বিন্দু কেঁদেই যাচ্ছে অঝোরে। 
 
শিশিরের কি হল সেটা শিশির নিজেও জানে না, হঠাৎই বিন্দুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বিন্দু যেন তখনও বেহুঁশের মত কেঁদেই যাচ্ছে। শিশিরের অনুশোচনা আগেও হয়েছে কিন্তু এবারে মত খারাপ যেন আর কখনও লাগে নি। 
 
নিজের খাম খেয়ালীতে এত এত কষ্ট দিয়েছে নিজের ফ্যামিলি আর এই মেয়েটাকে এর মাফ যেন নেই। বিন্দু তখনও বিড়বিড় করেই যাচ্ছে, কেন শিশির এমন করল। হঠাৎ শিশির খেয়াল করল, বিন্দুর হাত পা বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। এই শীতে কিছুই পাতলা পাতলা জামাকাপড় পরে আছে ও।
 
শিশির বিন্দুকে টেনে বিছানায় নিয়ে গেল। বিন্দুর পুরো শরীর কম্বলে মুড়িয়ে দিয়ে চুপ করে বিন্দুকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। একটু ধাতস্ত হতেই বিন্দু তাড়াক করে উঠে বসল। শিশিরের কাছে থেকে দূরে সরে যেতে চাইলে শিশির ওর হাত চেপে ধরল। 
 
বিন্দুর চোখে চোখ রেখে গভীর স্বরে বলল,
___ " জানো বিন্দু ওই দিন কেন পালিয়ে গিয়ে ছিলাম কাপুরুষের মত "?
বিন্দু এবার ছুড়াছুড়ি থামিয়ে বড়বড় পানি ভরা চোখে তাকালো শিশিরের দিকে। শিশির বলতে লাগল,
 
___ " হুট করে বিয়ে ঠিক করেছিস সবাই। জিনিসটা আমি মানতে পারি নাই। তারপর তোমার সাথে দেখা হল একটু কথা হল। কিন্তু গায়ে হলুদের দিন যে কি হল সেটা আমি নিজেও জানি না। 
 
ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি। সংসার সামলানো, অন্য মেয়ের দ্বায়িত্ব নেওয়া সব মিলিয়ে আমি পারছিলাম না বিন্দু।"
শিশির বলেই চলল,
___ " তাই ডেনমার্কের চাকরির অফার পাওয়া নিজের ক্যারিয়ার সব ভেবে চলে গিয়েছিলাম। 
 
কিন্তু একবারও তখন তোমার কথা,মনে আসে নি। কিন্তু জানো বিন্দু বিদেশ যাওয়ার পরে ধীরে ধীরে তোমার কথা মনে আসা শুরু হল৷ নিজের মধ্যে অনুশোচনা আরম্ভ হল। 
 
নিজেকে কোন ভাবেই ক্ষমা করার উপায় আমার কাছে নেই। যতটুকু না তুমি কষ্ট পেয়েছ তার চেয়ে বেশি শাস্তি পেয়েছি আমি আমার অপকর্মের।"
 
শিশিরের গলা এবার ধরে এলো। বিন্দু আগ্রহ আর চোখের পানি নিয়ে শিশিরের কথা শুনেই যাচ্ছে। শিশির বিন্দু হাত শক্ত করে চেপে ওর বুকে ধরে বলল,
 
___ " বিন্দু তোমার তো আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু তোমার ফ্যামিলি পাশে ছিল। কিন্তু জানো গত তিনবছর আমার আব্বু আমার সাথে কথা বলে না। বোনটা আর মা কথা বলে অপরিচিত মানুষের মত। আর তুমি.....?
 
চমকের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখো সবার আগে প্রশ্ন করতাম তুমি কেমন আছো? বিন্দু আমি আমার কৃতকর্মের ফল পাচ্ছি পারো না আমাকে একটু ক্ষমা করতে "।
 
শিশির বিন্দুর হাত কপালে লাগিয়ে টপটপ করে পানি ফেলতে লাগল। বিন্দুর মনে হচ্ছিল এ পৃথিবীতে একজনই অসহায় আছে আর সেটা হল ও। 
 
শিশিরকে ক্ষমা করা উচিত না কি করা উচিত সেটা ও মিলাতেই পারছে না। উপরওয়ালা এ কেমন সংকটে ফেলেছে ওকে।
 
শিশির তাড়াতাড়ি বিন্দুর হাত ছেড়ে চোখ মুছে নিল। পৃথিবীতে বিরল একটা জিনিস হল ছেলেদের চোখের পানি। 
 
যদি কোন ছেলে কোন মেয়ের সামনে কাঁদে তো বুঝতে হবে ওই মেয়েটাই ওই ছেলেটার পৃথিবী। হঠাৎ কনার বলা এই কথা গুলো মনে পড়ল বিন্দুর। আসলেই কি তাই হয়? বিন্দু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় রাত দুটো বাজতে চলল। 
 
শিশির তখন ও দিক তাকিয়ে চোখ মুছে বলল,
___ " কফি খাবে বিন্দু "।
বিন্দু মাথা ঝুলিয়ে হ্যাঁ বলল। 
 
প্রচুর শীত লাগছিল ও। শিশির গেল কফি বানাতে তখন বিন্দু কম্বলটা কান পর্যন্ত টেনে দিয়ে বালিশের সাথে ঢেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। শিশির দুই মগে কফি এনে দেখলো বিন্দু কান পর্যন্ত কম্বল টেনে দিয়ে শুয়ে আছে আস্তে আস্তে ডাক দিল কিন্তু কোন সাড়া নেই। কম্বল একটু খানি সরিয়ে দেখে বিন্দু ঘুমিয়ে পড়েছে। শিশির আর কিছু না বলে লাইট অফ করে বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে কফির মগ হাতে বই নিয়ে বসল। 
 
বিন্দুর শরীরে ভাল করে কম্বল টেনে দিল ও। পড়তে পড়তে কখন যে চোখ লেগে আসলো শিশিরের সেটা ও নিজেও জানে না। প্রচন্ড শীতে একটু উষ্ণতার জন্য ঘুমের মধ্যে ও নিজেই কম্বলের মধ্যে ঢুকে পড়লো। 
 
এ যেন না চাইতেও দুজনের কাছাকাছি আসা।
পরের দিন সকালে নিনা আর তুলি রেডি হয়ে আটটার দিকে গেল বিন্দুর রুমে ওকে ডাকতে। অনেকক্ষন ডাকাডকির পরেও দরজা খুললনা যখন বিন্দু। 
 
ওরা আবার গেল নিজেদের রুমে। পরে আবির বিপ্লবকে সাথে নিয়ে চারজনে এলো শিশিরের রুমের সামনে। তিনবার নক করার পরে শিশির আলুথালু বেশে এসে দরজা খুলে দিল। 
 
চোখ ঢলতে ঢলতে শিশির দেখলো সামনে চারজন দাঁড়ানো। কিন্তু তখনও শিশিরের খেয়াল নেই যে বিন্দু অঘোরে ওর খাটের উপরে ঘুম। শিশিরকে এই অবস্থায় দেখে আবির বিরক্ত হয়ে বলল,
____ " সালা এখনও তুই ঘুমাচ্ছি? "
___ " আচ্ছা তোরা বয় আমি রেডি হচ্ছি দশমিনিট।".
শিশির একথা বলেই টাওয়াল কাঁধে ওয়াশরুমে ঢুকলো। 
 
ওরা সোফায় বসতেই নিনার চোখ পড়লো খাটের দিকে। কম্বলের তলা থেকে কার যেন পায়ের আঙুল বের হয়ে আছে। ও আবিরের হাত ধরে ঝাঁকা দিল। 
 
আবির বিরক্ত হয়ে তাকাতেই, নিনা ইশারা দিয়ে খাটের উপরে দেখালো। আবির যেন জমে গেল। আরো ভয় লাগতে লাগল ওর যদি নিনা আর তুলি বিন্দুকে বলে দেয় তখন কি হবে। আবির এবার বিপ্লবকে দেখালো কাহিনীটা। 
 
তাড়াতাড়ি দুই বন্ধু নিনা আর তুলিকে চাবি দিয়ে ওদের রুমে পাঠিয়ে দিল। আবির মাথায় হাত দিয়ে বল্লল,
___ " বিপ্লবরে সব শেষ রে সব শেষ "।
___ " যদি বিন্দুর কানে এসব যায় তখন কি হবে রে আবির? "
বিপ্লবও খুবই চিন্তিত হয়ে বলল। ঠিক এমন সময়.........
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(৯)

ঠিক এমন সময় শিশির মাথা মুছতে মুছতে বের হল ওয়াশরুম থেকে। শিশিরকে দেখেই আবির দৌড়ে যেয়ে ওকে ঝাপটে ধরে বলল,
___ " হারামী করছত টা কি? "
___ " মানে? "

শিশির অবাক চোখে প্রশ্ন করল। বিপ্লব চোখের ইশারায় খাটের উপরে দেখালো। শিশির খাটের দিকে চেয়েই যেন জমে গেল। এই পা জোড়া কার। হঠাৎই মনে পড়ল এটা তো বিন্দু তারমানে বিন্দু এখনও ঘুমাচ্ছে। 

শিশির মুচকি একটা হাসি দিয়ে বিছানার কাছে যেয়েই কম্বলটা আস্তে করে সরিয়ে দিল মুখের উপর থেকে। বিন্দুর মুখের উপরে চুল গুলো এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে।
 
আবির আর বিপ্লব দুজনে গলা টানা দিয়ে বিন্দুকে দেখে থ হয়ে গেল। বিপ্লব শিশিরকে বিছানার কাছ থেকে টেনে নিয়ে এসে বলল,
___ " বিয়ের আগেই হানিমুন পর্ব শেষ "।
___ " সবাইকে এক পাল্লায় মাপিস কেন? "

শিশির টিশার্ট বের করে পরতে পরতে বলল। আবির শিশিরকে ঘুরিয়ে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে বলল,
___ " সত্যি কথা বল কিন্তু সালা না হলে জানে মেরে ফেলবো।"

ঠিক এমন সময় বিন্দু আড়মোড় ভেঙে উঠে বসেই দেখলো সামনে আবির শিশির আর বিপ্লব একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। 

এই সাত সকাল বেলা ওরা এই রুমে আসলো কি করে। তার চেয়েও বড় কথা দরজা খুললো কে। বিন্দুকে উঠে দেখেই আবির সরে গেল শিশিরের কাছে থেকে। বিপ্লব বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " শুভ সকাল "

বিন্দু কিছু না বলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আবির শিশিরকে ফিসফিসিয়ে বলল,
___ " দোস্ত হেতি এখনও ঘোরের মধ্যে আছে তারে ঘোরের থন টাইন্না বাইর কইরা রেডি কইরা লইয়া আয়"।
এই বলেই দুজনেই চলে গেল। বিন্দু এই প্রথম শিশিরকে বলল,
___ " আপনারা আমার রুমে ঢুকলেন কি করে? "
___" ও ম্যাডাম আমি আপনার রুমে না আপনিই আমার রুমে "।

শিশিরের কথা চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে বিন্দুর সব মনে পড়লো। রাতে কাঁদতে কাঁদতে এসেছিল এই রুমে পরে মনে হয় ঘুমিয়েই পড়েছিল। লজ্জায় বিন্দু লাল হয়ে গেল। শিশির আবার বলল,
___ " রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নেও বের হব "।

বিন্দু কথা না বাড়িয়ে একটা চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে রওনা হল নিজের রুমের দিকে। বিন্দু যখন একেবারে রেডি হয়ে নিচে নেমে আসলো তখন কম্পাউন্ডে সবাই দাঁড়ানো। শিশিরের দিকে চোখ পড়তেই বিন্দু চোখ নামিয়ে নিল। আবির বলল,
___ " নাস্তা করে বের হই কি বলো "।

সবাই সায় দিল এতে।  নাস্তা করতে করতে ওরা প্লান ঠিক করল এখন বের হয়ে আগে ঝুলন্ত সেতুতে যাবে তারপর বৌদ্ধ মন্দির আর চাকমা রাজার বাড়িতে যাবে। 
নাস্তা সেরে সবাই হৈ হৈ করে বের হল। ঝুলন্ত সেতুতে যেয়ে শিশিরের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ছবির চেয়েও সুন্দর এই জায়গাটা। নিচে কাপ্তাই লেকের সচ্ছ পানি আর উপরে ব্রিজটা। 

পুরোটাই কাঠের পাটাতন আর উপরে লোহার আংটা গলিয়ে ব্রিজটাকে পানির উপরে ধরে রেখেছে। 
ব্রিজের উপরে বেশ কিছুক্ষন ছবি তুলল ওরা। যেহেতু সকাল বেলা ভীড়ও তেমন বেশি না তাই ছবি তোলায় কোন সমস্যা হল না। গ্রুপ ছবি তোলার পরে হঠাৎ তুলি বলল,
___ " বিন্দু আর শিশির ভাই এক সাথে  দাঁড়াও পিক তুলবো।"

বিন্দু আমতা আমতা করলেও শিশির হাত ধরে বিন্দুকে দাঁড় করিয়ে দিল ওর পাশে। বিন্দু বেশ রাগি একটা লুক নিয়ে শিশিরের দিকে তাকালেও শিশির যেন দেখেও দেখলো না ওর সেই চাহনী। 

ব্রিজের ও পারে যেয়ে ওরা উঠলো বেশ উঁচু এক টিলার উপরে যেখান থেকদ পুরো ভিউটা দেখা যায় ব্রিজের। আসলে প্রকৃতি এত সুন্দর হয় যে সেটা পার্বত্য জেলাগুলোতে না আসলে বোঝা যায় না। নিনা আবিরকে জিজ্ঞেস করল,

___ " আচ্ছা এ পাশের ওই দিকে কি? "
আবির উওর দেওয়ার আগেই বিন্দু বলল,

___ " নিনা ভাবি ওই পাশে চাকমা গ্রাম। আমাদের এই মোটেল দুইটাই ওদের জায়গায় করা হয়েছে। ওই পাশে বেশ বড় একটা গ্রাম আছে। কিন্তু ওদিকে আসলে ওতটা কেউ যায় না কারন ওরা নিরিবিলি থাকতে  পছন্দ করে তাই আর কি "।

নিনা বেশ পরখ চোখে ওদিকে দেখতে লাগল। সাথে তুলিও যোগ দিল। দশটার দিকে ওরা দুইটা সিএনজি নিল বৌদ্ধ মঠে যাওয়ার জন্য। পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মঠ এটা। আজকে ওদের চিবর দান অনুষ্ঠান তাই দূর দূরান্ত থেকে অনেক অনেক মানুষ আসিছে আজকে। 

সেই মানুষের স্রোতে ওরাও  মিশে গেল। শিশির হাঁটছে আর খেয়াল করছে এখানে চারপাশে প্রচুর বানর। নিনা হিজাব বেধে মাথায় চাদর জড়িয়ে এসেছিল কিন্তু মঠের মধ্যে ঢোকার আগে একজন সন্নাসী নিনাকে আটকালো। নিনার সাথে আবিরও দাঁড়িয়ে পড়লো। 

আদিবাসী টানের বাঙালি ভাষায় উনি যেটা বুঝালো তা হল, নিনা মাথায় হিজাব বা ঘোমটা দিয়ে প্যাগোডায় ঢুকতে পারবে না। এটা তাদের ধর্ম পরিপন্থী।  

যদি ভেতরে যেতে চায় মাথার কাপড় ফেলে তারপর ঢুকতে হবে। ওরা সবাই তো থ। এমন নিয়ম আগে জানত না ওরা। আর নিনাও গোঁ ধরেছে মাথার হিজাব খুলবে না। অগত্য নিনা আর আবির বাইরে বসল আর বাকিরা ভেতরে ঢুকলো। 

স্থপত্যের এক অপূর্ব কারুকার্য খচিত এই বৌদ্ধ মঠ গুলো। কোথাও ফুল কোথাও ড্রাগনের কারুকাজ। মূল মন্দিরে বৌদ্ধের বিশাল এক সোনালী মূর্তি। 

পাশে তাদের ধর্মগুরুর মমিকৃত লাশ। অবাক হয়ে বিন্দু দেখতে লাগল সেই মানুষটাকে। এতদিন হয়ে গেছে তাও মনে হচ্ছে মানুষটা যেন মারা যায় নি চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে।

নিনা আর আবির বসে বসে বাদাম খাচ্ছে আর আশেপাশের মানুষ দেখছে। এতদিন ঢাকায় কোন আদিবাসী দেখলে সবাই মিলে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতো আর আজকে চারদিকে এত আদিবাসীদের মধ্যে ওরা কয়েকজন বাঙালী আর বাকিরা ওদের দেখতে। কেমনই জানি একটা ফিল হচ্ছে। নিনা মুখ নামিয়ে বলল,
___ " আর কখনও রাস্তায় কারো দিকে তাকাবো না? "
___ " তুমি রাস্তায় কার দিকে তাকাও?  ছেলেদের দিকে নাকি?"
আবির অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। নিনা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,
___ " ফালতু জোক কম মারবা,বলে দিলাম। মেজাজ এমনিতেই খিঁচে আছে।"

আবির কোন কথা,না বলে এক প্যাকেট বিস্কিট বের করে নিনার হাতে দিতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে জানি একটা বানর এসে থাবা দিয়েই বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে দৌড় দিল। 

আবির আর নিনা হাঁ করে তাকিয়ে থাকল বানরের যাওয়ার পথের দিকে। শিশির আর বিন্দু দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিল আর বিপ্লব তুলির হাত ধরে হাঁটছিল। মঠের মধ্যে একজায়গায় যেয়ে দেখলো অনেক গুলো মোম জ্বলছে আবার অনেকেই মোম জ্বালিয়ে রাখছে। পরে শুনে দেখলো এতে নাকি মবের ইচ্ছা,পূরন হয়। 

শিশিরকে মোম জ্বলাতে দেখে বিন্দু  অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বিন্দুর অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে শিশির হেসে বলল,
___ " পেয়েও হারিয়েছি যাকে,
     পাইতে আবার ফিরিয়া তাকে।
     মনের মধ্যের জ্বালায়ে মোম,
     খুঁজি যে তাকে সারাটি ক্ষন।"

শিশিরের মিলানো ছন্দ শুনে বিন্দু কিছু না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। সারা মঠ ঘোরা শেষে ওরা চলল চিবর প্রদানের অনুষ্ঠান দেখতে। কিন্তু এত এত মানুষের সারি দেখে ওরা আর ভেতরে ঢুকলো না। 
বাইরে থেকে একটু দেখেই চলে আসলো। ওরা যখন ফিরে আসলো নিনা আর আবির তখন ঝগড়ায় ব্যস্ত। বিপ্লব বিরক্তির স্বরে বলল,

___ " সারাদিন বাচ্চাদের মত ঝগড়া করে কি মজা পাইস তোরা একটু বলবি আমারে।"
বিপ্লবের ঝাড়ি শুনে দুজনেই ঝগড়া বন্ধ করে দুদিকে ফিরে বসে রইল। শিশির বলল,
___ " বারোটা বাজতেছে নেক্সট প্লান কি আমাদের? "

___ " চাকমা রাজার বাড়ি দেখতে যাব?"
আবির উওর দিল। বিপ্লব বলল,
___ " লাঞ্চের জন্য লেট হয়ে যাবে না রে?"

___ " ঘন্টা খানেকের মধ্যেই দেখা হয়ে যাবে। একটা দেড়টার মধ্যেই লাঞ্চ করতে পারব।"
শিশির উঠতে উঠতে উওর দিল। সবাই আস্তে আস্তে এগোলো বিশাল এক বট গাছের দিকে। গাছটা একদম কাপ্তাই লেকের ধার ঘেসেই। 

গাছের গোঁড়া দিয়ে নিচে নামলেই খেয়া পাওয়া যায়। ছোট ছোট উপজাতিদের ছই ওয়ালা নৌকা। ওতে কইরেই ও পারে যেতে হয় চাকমা রাজার বাড়ি। নৌকায় উঠতে যেয়ে বিন্দু লা পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। 
পিছনেই ছিল শিশির একদম সময় মত বিন্দুর হাত চেপে ধরে। বিন্দু টাল সামলাতে শিশিরের বুকের কাছের জ্যাকেট খামচে ধরে। শিশির তাড়াতাড়ি ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
___ " বিন্দু ঠিক আছো তো? "
___ " হুম "।
উওর দিয়েই বিন্দু বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগল। বাকিরা আগেই নৌকায় উঠে বসে ছিল। ওরা ডাকতে লাগল ওদের। তখন শিশির বিন্দুকে বলল,
___ " আমি আগে উঠে হাত দিচ্ছি তুমি আমার হাত ধরে ওঠো "।

তারপর শিশির শক্ত করে হাত ধরে বিন্দুকে টেনে তুললো নৌকায়। সারাপথ নৌকায় শিশিরেএ হাত ধরে ভয়ে ভয়ে বসে রইল বিন্দু। পাতলা নৌকা একটু পর পরই নড়ে ওঠে। বিন্দু যে পানিতে বিশাল ফোবিয়া আছে এটা হয়ত শিশির জানেই না। 

নৌকা যখনই দুলে ওঠে বিন্দু শিশিরের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। কি যে এক অবস্থা।নৌকা যখন ওপারে পৌঁছাল তখন........
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১০)

ওপার পৌছানোর পরে বিন্দু কোন মতে চোখ কান বুজে শিশিরের হাত শক্ত করে ধরে নিচে নামল। শিশিরের বারেবার মনে হচ্ছিল যাক না এই সময়টুকু থেমে থাকুক না বিন্দুর হাত ওর হাতে অনন্ত কাল  ধরে। 

বিন্দু হাঁটছে আর ভাবছে এই মানুষটাকে এত বছর ধরে এত ঘৃণা করার চেষ্টা করেছে কিন্তু সামনে আসলে এত তালগোল কেন পাকিয়ে যাচ্ছে। চাকমা রাজার বাড়ি বেশ বড় সড়ই।এখন এখানে কেউ থাকে না জাদুঘর হিসাবে ব্যবহার করা হয়। 

সবাই কেমন জানি আপনা আপনিই জোড়া বেঁধে ঘুরতে লাগল। বিন্দু _ শিশির, আবির__নিনা, আর বিপ্লব__তুলি। রাজার বাড়ির ঘোরা শেষে বাড়ির সামনে বিশাল দুই সিংহের মূর্তি নিনা বাহানা করল ও মূর্তির উপরে বসে ছবি তুলবে। আবির ঢোক গিলে বলল,

___ " জান বেচারাদের উপরে একটু দয়া খাও "।
___ " মানে? এই কি বললা তুমি? দয়া খাবো মানে কি।"

নিনা চোখ মুখ খিচিয়ে জিজ্ঞেস করল। আবির আশপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ শোনে কি না তারপর নিনার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল,

___ " সিংহ গুলো অনেক বছরের পুরোনো তো তাই বুড়ো হয়ে গেছে। তোমার ভার সইতে পারবে না আর কি "!

আবিরের উওর শুনে নিনা যেন রাগে ফেটে পড়ল। আবিরকে কিছু বলবে তার আগেই তুলি আর বিপ্লব এসে হাজির। নিনা আপাতত ঝগড়া বাদ দিল। কারণ রাত তো আছেই তখন চান্দুরে ছাই দিয়ে ধরবে।
 
বিন্দু পাশেই সারি দেওয়া অনেক গুলো আদিবাসীদের স্টল আছে ওখান থেকে শাল দেখছিল বাসার সবার জন্য। শিশির পকেটে হাত দিয়ে বিন্দুকে দেখছে অপলক দৃষ্টিতে। মনে হচ্ছে বিন্দুর মুখ থেকে মায়া চুয়ে চুয়ে পড়ছে আর সেই মায়ায় ও ভিজে যাচ্ছে। বিন্দু হঠাৎ বলল,

___ " আচ্ছা দেখেন তো আমার আম্মু আর আপনার আম্মুকে মানাবে এই শালে?"
বিন্দুর কথা শুনে শিশির অবাক হল এই ভেবে যে,  ওর আম্মুর কথা এখনও ভাব্দ বিন্দু। শিশির ভাল করে দেখদ বলল,
___ " নীলাম্বরী কালারটা খুবই সুন্দর দুজনকেই মানাবে।"

তখন বিন্দু ওখান থেকে ছয়টা শাল নিল। শালের ব্যাগ হাতে নিতে যাবে এমন সময় শিশির ব্যাগ ধরে বলল,
___ " শপিং করা মেয়েদের কাজ কিন্তু শপিংয়ের ব্যাগ টানা ছেলেদের কাজ।"

বিন্দু কিছু বলবে তার আগেই শিশির ওর হাত থেকে শপিং ব্যাগ টেনে নিয়ে নিল। পাশের এক দোকানে চাকমাদের হাতে বোনা থ্রিপিস আছে ওরা তাই দেখতে লাগল। 

শিশিরের চোখে পড়ল কাঠ গোলাপ কালারের এক থ্রিপিসের উপরে। মনে হল এই থ্রিপিসে বিন্দুকে খুব মানাবে। কিন্তু এটা বিন্দুকে দেবে কি করে? বিন্দু তো কিছুতেই নেবে না। শেষ মেষ একটা উপায় বের করল ও। বিন্দুর কাছে যেয়ে বলল,
___ " বিন্দু শোনো"।
___ " বলেন কান খোলা আছে"।

বিন্দু থ্রিপিস দেখতে দেখতে বলল। শিশির গলা খাকারি দিয়ে বলল,
___ " আম্মু, আন্টি, চমক, কনা আর তোমার জন্য থ্রিপিস দেখো তো "।
বিন্দু এবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাতে শিশির ওই দোকানের মেয়েটার সামনেই বিন্দুর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। বিন্দু আশ্চর্য হয়ে গেল ওর অবস্থা দেখে।

বিন্দু চুপ হয়ে গেল আসলে এক অজানা ভাল লাগায় মন আক্রান্ত হয়ে গেল ওর। বিন্দু কিছু না বলে মুখ নিচু করে রইল। দোকানী মেয়েটা হেসে বলল, ওদের দুইজনকে খুব ভাল মানিয়েছে। 

কেনাকাটা শেষ করে ওরা সবাই যখন এক হল তখন শিশির দেখলো, বিপ্লব আর আবির দুইজনই শপিংয়ের ভারে কাত হয়ে যাচ্ছে। বিপ্লব নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,
___ " দোস্ত আমরা না হয় বিয়াইত্তা মানা যায় যে হাতে এই বোঝা কিন্তু তোর এই পালা কেন?"
শিশির চোখ গরম করে তাকালো ওর দিকে। বিন্দু লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো। সবাই মিলে চলল ওরা   দুপুরের লাঞ্চ করতে। 

আজকে সব মেয়েরা বায়না ধরেছে দেশী লাঞ্চ করবে মানে সব দেশীয় খাবার খাবে তাই রাস্তার পাশের ছোট একটা হোটেলে ঢুকলো ওরা।

যেয়ে বসতেই ছোট একটা ছেলে এলো ওদের খাবারের অর্ডার নিতে। কাপ্তাই লেকের সুস্বাদু মাছ গরুর মাংস, ডাল আর ধোঁয়া উড়া ভাত খেয়ে যখন ওরা বের হল তখন আসরের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে প্রায়। 
ছেলেরা তো ভালই এমনকি মেয়েরাও রান্নার প্রশংসা করল। মোটেলে ফেরার পথে ওরা প্যাকেট বিরিয়ানী কিনে নিল আজকে আর রাতে ডিনারের জন্য কেউ বের হবে না। 

কালকে সকালের প্লান হল সারাদিন শুভলং ঝর্না আর বরকল উপজেলাটা ঘুরে দেখবে ওরা।
ওরা মোটেলের সামনে নামতেই  হঠাৎ আবিরের ফোনে কল আসলো। কথা বলতে বলতে আবিরের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ফোন রেখেই বিপ্লবকে জড়িয়ে ধরে বলল,
___ " দোস্ত ডিল ফাইনাল হয়ে গেছে দিল্লীর পার্টির সামনে সপ্তাহে ইন্ডিয়া যেতে হবে।"

আবিরের কথা শুনে সবাই খুশি হয়ে গেল। বিপ্লব শিশিরকে বলল,
___ " দোস্ত যাবি ইন্ডিয়াতে চল ঘুরে আসি'।

___ " হঠাৎ ইন্ডিয়া? "
শিশির অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। আবির হেসে বলল,
___ " ইন্ডিয়ায় হঠাৎ না ওখানে আমাদের চারজনের যাওয়ার প্লান আগে থেকেই আর রাঙ্গামাটি এসেছি হঠাৎ!  এখন দশ কথার এক কথা তুই যাবি "।

___ " কিন্তু ভিসা নেই আমার ইন্ডিয়ার।"
শিশির বলে উঠলো। বিপ্লব তখন বলল,
___ " ডেনমার্কের পাসপোর্ট আছে তোর ভিসায় আটকাবে না "।
তখন তুলি হঠাৎ বিন্দুকে বলল,

___ " তুমিও ব্যাগ প্যাক করবে আমাদের সাথে ইন্ডিয়া ট্রিপে তুমিও যাচ্ছ।"
___ " না ভাবি হঠাৎ ইন্ডিয়া কেমনে কি? আমি বরং অন্য সময় যাব "।
___ " কোন কথা না তোমাকে ট্রিপটা আমি স্পন্সার করব। আর আমি এটাও জানি তোমার ইন্ডিয়ার ভিসা আছে গত বছরই তো গিয়েছিলে তুমি!"

বিন্দু একপ্রকার না ই করে দিচ্ছিল কিন্তু ওদের ট্যুর প্লান শুনে আর রাজি না হয়ে পারল না। সেদিন সন্ধ্যার পরে সবাই শিশিরের রুমে হাজির হল। 

বিপ্লব বুঝিয়ে বলল ওদের ট্যুর প্লানটা। প্রথমে ওরা যাবে বাসে করে কলকাতা তারপর ওখান থেকে ট্রেনে করে দিল্লী। দিল্লীর কাজ শেষ করে আগ্রার তাজমহল আর দিল্লী ফোর্ট দেখে আবার ট্রেনে করে জাম্মুর শ্রী নগর যাবে।

 ওখান থেকে কাশ্মীর ঘুরে তারপর প্লেনে করে শ্রীনগর থেকে কলকাতা। আর কলকাতা থেকে ঢাকা। প্লান শুনে সবাই লাফিয়ে উঠলো। 

আবির আর বিপ্লব ওখানে বসেই মোটামুটি ফোনে সব বুকিং আর ট্রেনের টিকেটের ম্যানেজ করে ফেলল।
শিশির যেন খুশিতে উড়তে লাগল।ইসস বিন্দুর সাথে আরো কিছু দিন একত্রে ঘুরতে পারবে। এর চেয়ে আর বেশি কি লাগে লাইফে। 

বিন্দুও বেশ খুশি এই ভেবে যে  কাশ্মীর দেখার শখ ওর অনেক দিনের। হুট করে এমন চান্স চলে আসবে সেটা ও বুঝতেই পারে নি। প্লানিং করা শেষে ওরা যে যার রুমে চলে গেল।

আগামী শুক্রবারই ওরা রওনা দেবে ঢাকা থেকে। তাই বাসায়ও জানিয়ে দিল। সবাই যখন রুমে যাচ্ছিল আবির পিছন থেকে বিন্দুকে ডাক দিল,
___ " বিন্দু শোনো "।
___ " জি ভাইয়া "।
___ " বড় ভাই হিসাবে কিছু কথা বলি শোনো। আমি জানি শিশির যেটা করেছে সেটা মহা অন্যায়। কিন্তু জানো গত তিনবছর প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে ও। যদি পারো ওকে আর একটা সুযোগ দিও।"
___ " কিন্তু ভাইয়া বাসায়..... "

___ বিন্দু মাঝে কোন কিন্তু এনো না। আর হ্যাঁ বাসায় বলো না যে শিশির ইন্ডিয়ার ট্যুরে আমাদের সাথে যাচ্ছে। যদি পারো ওই পাগলটাকে আর একবার সুযোগ দিও।"

এটুকু বলেই আবির চলে গেল ওর রুমে বিন্দুর চোখ থেকে টপটপ করে পানির ফোঁটা গুলো গড়িয়ে বুকের উপরে পড়তে লাগল। 

এ কোন কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে ও। কেন উপরওয়ালা বারেবারে এমন পরীক্ষা নিচ্ছে। 
বিন্দু শালটা জড়িয়ে নিচে নেমে এলো। এদিকে আটটার পরে সব শুনশান হয়ে যায়। বিন্দু মোটেল কমপাউন্ডেই হাঁটতে লাগল। 

শিশির বের হয়েছিল আবিরের রুমে যাবে তাই কিন্তু হঠাৎ দাঁড়িয়ে দেখলো বাইরে কার পার্কিংয়ের ওখানে চুপ করে বসে আছে কে যেন। ভাল করে তাকাতেই দেখলো ওটা বিন্দু শিশির তাড়াতাড়ি লিফটে করেই নিচে নেমে আসলো। 

বিন্দু তখনও চুপ করে মাথা নিচু করে বসে আছে। শিশির কোন কথা,না বলে বিন্দুর পাশে বসতেই বিন্দু চোখ  তুলে ওর দিকে তাকালো। কিন্তু সে চাহনিতে কোন প্রান নেই। 

শিশিরের মনে হচ্ছি ও যেন আজ নিজের কাছেই নিজে মৃত্য। একটা মেয়েকে ও জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিয়েছে। শিশির বিন্দুর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

___ " বিন্দু আমি জানি আমার ক্ষমা নেই তারপরও বলছি আর একবার সুযোগ দেও আমাকে প্লীজ।"
বিন্দু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। শিশির চুপ করে বসে সেই কান্না দেখতে লাগল। 

কারণ ওর যে বলার কিছুই নেই আজ এই কান্নার বীজ যে ও নিজের হাতে লাগিয়েছিল তিন বছর আগে। বিন্দু ওর কাঁধে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে লাগল। সেই কান্না যেন কষ্ট গুলোকে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।..........
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১২)

বিন্দু একটু নড়ে চড়ে বসলো। ভোরের সূর্য তখন পুরোটা ওঠে নি আবার রাতের আধাঁরের ছোঁয়াও পুরোটা যায় নি। শিশির আস্তে করে বিন্দুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
 
এযেন সকল সুখের পরশ এসে ছোঁয়া দিল শিশিরের মনে। বিন্দু তখন জেগেই ছিল। শিশির কানের পেছনে চুল গুজে দেওয়ার সময়ই টের পেয়েছিল বিন্দু কিন্তু চোখ বুজে ছিল৷ 

শিশির যখন ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাগল বিন্দুর মনে। হ্যাঁ অন্যায় করেছে শিশির কিন্তু এই মূহুর্তে একদমই খারাপ মনে হল না ওর। 

যদি ভাল নাই বাসতো তাহলে অন্য জায়গায় কিস করত। ভাল বাসে দেখেই কপালে আদর করেছে। শিশির বিন্দুর মাথাটা ধরে নিজের ঘাড়ের উপরে রেখে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
 
এর একটু পরেই ওরা যশোর বেনাপোল কাষ্টমস এর সামনে চলে এলো। শিশির আস্তে আস্তে ডাক দিল বিন্দুকে,
___ " এই বিন্দু ওঠো চলে এসেছি নামতে হবে এখন "।

বিন্দু কিছু না বলে পিটপিট করে চোখ খুলে চারিপাশ দেখে সোজা হয়ে বসল। বিপ্লব পিছনে ফিরে বলল,
___ " শোন এখানে নেমে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে হালকা কিছু খাবো। আর একবারে কলকাতা যেয়ে নাস্তা খাবো "।

___ " ক্ষিধায় মরে যাচ্ছি আর উনি আছে কলকাতায় যেয়ে খাওয়ানোর তালে "।
তুলি উঠতে উঠতে বলল। বিপ্লব বিরক্তির সুরে বলল,

___ " এখন সকাল সকাল ফ্রি আছে সব। একটু পরে বিশাল লাইন পড়বে। আর উনি আছে খাই খাই করার তালে!"
তুলি জানি কি কি বলল। 

তা আর শোনা গেল না। শিশির জোর করে বিন্দুর লাগেজ গুলো নিয়ে নিল। বিন্দুর মানা কানেই তুললনা। 
গাড়িতেই ওদের ডিপার্চার এর একটা ফর্ম দিয়েছি সেটা পূরন করে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সারল সবাই। কিন্তু সমস্যা হল আবিরের পাসপোর্ট নিয়ে৷ 

আবিরের NOC নিয়ে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে বেশ ভালো ক্যাঁচাল লাগে৷ পরে আবির বাদে সবাই এসে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন শেষ করে আবিরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। 

বিন্দুর সারারাত বাসে থেকে কেমন জানি লাগছিল। মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরাচ্ছে তাই ও শিশিরের বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। শিশির পেছন থেকে হাত দিয়ে ওকে আকড়িয়ে ধরল।
 
নিনা বেশ চিন্তিত মুখে অপেক্ষা করছে আবিরের জন্য।অনেক্ষন হয়ে যাওয়ার পরে বাসের সবার বিরক্তি বাড়তে লাগল তাই ওরা সবাই বাস চলে যেতে বলল। 

প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আবির এসে হাজির। টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করে তারপর এসেছে। সে যাই হোক এখন তো পৌঁছাতে হবে কলকাতা। বিপ্লব বলল,

___ " তিনটা ওয়ে আছে এখন থেকে কলকাতা যাওয়ার। শেয়ার অটোতে বনগাঁ পর্যন্ত যেয়ে ট্রেনে করে শিয়ালদহ স্টেশনে তারপর ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে। বা বাস আছে এখান থেকে কলকাতা পর্যন্ত "।
তখন আবির বলল,

___ " এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গেছে।এক কাজ করি ট্যাক্সি করে সোজা চলে যাই হোটেলে টাকা বেশি লাগলেও তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। "

ওরা যেখানে ছিল সেখানে অনেক ট্যাক্সির দালাল ছিল তাই কথা না বাড়িয়ে ওরা সামনে হাঁটতে লাগল। বিন্দু শিশিরকে জাপটে ধরে আছে। 

ওর কেন জানি না প্রচন্ড খারাপ লাগছে। কিন্তু ওরা তো জানত না সামনে আরো বড় বিপদ অপেক্ষা করছে ওদের জন্য।

ওরা আট সিটের একটা ট্যাক্সি ঠিক করল ১৪০০ রুপী দিয়ে। চুক্তি হল একদম নিউমার্কেটে ওদের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসবে। ট্যাক্সিতে উঠেই বিন্দু এলিয়ে পড়লো। 
কেন যে এত খারাপ লাগছে সেটাই বুঝতে পারছে না। বর্ডার থেকে তিনটা নতুন সিম কিনেছে ওরা ১৫০ রুপি করে। মজার কথা হল সেই সিমে ১০০ রুপি রিচার্জ করে ২ জিবি নেট আর ফ্রি টকটাইমও পেয়েছে। 

আবির, বিপ্লব আর বিন্দুর আগেই সিম ছিল তাই ওরা আর কেনে নি। শিশিরের খুব চিন্তা হতে লাগল বিন্দুকে নিয়ে। সিট গুলো বেশ চওড়া ছিল। তাই বিন্দুকে বলল,
___ " তুমি এক কাজ করো আমার কোলে মাতগা দিয়ে শুয়ে পড়ো।"
___ " উহু লাগবে না?!"

বিন্দু মাথা নেড়ে বলল। শিশির বিরক্ত হয়ে বলল,
___ " প্লীজ বিন্দু তর্ক করো না তো "।

বিন্দু কিছু না বলে হ্যান্ড ব্যাগটা নিচে রেখে শিশিরের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। শিশির আস্তে আস্তে বিন্দুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। 

আর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। আশেপাশের দৃশ্য অনেকটাই বাংলাদেশের মত কিন্তু রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডের অক্ষর, মেয়েদের সাইকেল চালানো আর মাঝে মাঝে পোষাকের ফারাক দেখে বোঝা যায় যে এটা ইন্ডিয়া। বিপ্লব শিশিরকে বলল,

___ " দোস্ত এখান থেকে সোজা যে রোড ধরে যাচ্ছি এটার নাম যশোর রোড। "
___" কথা তো সেটা না কথা হল সবই তো ডলার এন্ডোস করে এনেছি পাসপোর্টে। রুপি করব কি করে এগুলোকে। "

___ " নিউমার্কেটের আশেপাশে অনেক মানিএক্সচেঞ্জ আছে ওখান থেকেই করাবো তখন রেট ভাল পাওয়া যায়। "।

আবির হামি দিতে দিতে উওর দিল। নিনা চিন্তিত ভঙিতে বলল,
___ " বিন্দু কি অবস্থা দেখেছো তোমরা মাথাই উঠাতে পারছে না মেয়েটা।"
___ " চিন্তা করো না আজকে রাতে ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে সব।"

বিন্দু ঘুরে শিশিরের পেটের দিকে মুখ করে শুয়ে রইল। বিন্দুর তপ্ত গরম নিঃশ্বাস শিশিরের পেট বুক সব জ্বালিয়ে দিতে লাগল। শিশির যেন অস্থির হয়ে উঠলো৷ 

বড়ই কঠিন হয় কিছু কিছু সময় নিজেকে আটকে রাখাটা। শিশির বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখার বৃথা চেষ্টা করল। অগত্যা উপায় না পেয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে রইল।

ওরা যখন নিউমার্কেটে ওদের হোটেলে পৌঁছালো তখন প্রায় ১২ টা বেজে গেছে বেলা। ক্ষুধায় সবার পেট চোঁচোঁ করছে। বিন্দু এই টানা দুই আড়াই ঘন্টা ঘুমিয়ে বেশ ভাল ফিল করছে। 

তাই গাড়ি থেকে বের হয়েই চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ওরা হোটেল ফ্যাব এ চারটা রুম বুক করেছিল কিন্তু যেয়ে দেখে বুকিং ক্যান্সেল করেছে হোটেল কতৃপক্ষ। সবার তো মাথায় হাত এখন কি হবে। এত এত ব্যাগপত্র নিয়ে কিভাবে কি করবে। শিশির বলল,

___ " এত প্যানিক হয়ে লাভ নাই অন সিজন তাই হয়ত কেউ বেশি টাকা অফার করেছে দিয়ে দিয়েছে রুম। তাই এখন করনীয় হল আগে ভাত খাব তারপর হোটেল খুঁজবো "।

___ " আশেপাশেই বেশ কিছু হোটেল আছে চিন্তা করো না ব্যবস্থা হয়ে যাবে "।

বিপ্লব আশ্বাস দিয়ে বলল। পরে ওরা সবাই একটু পাশেই যেয়ে এক মুসলিম হোটেলে খেতে বসল। খাবারের মেনু দেখে যে যার মত অর্ডার করে নিল। 

কিন্তু সমস্যা হল সবার পেটেই প্রচন্ড খিদা থাকা স্বত্তেও কেউই পেট ভরে খেতে পারল না। বাংলাদেশের প্রচলিত যেমন ঝাল ঝাল খাবার কিন্তু এখানকার খাবারগুলো কেমন জানি মিষ্টি মিষ্টি।
 
সবাই কোনমতে উদরপূর্তি করে বেরিয়ে এল। একটু খোঁজাখুঁজির পরে পাশের মারকুইজ স্ট্রিটে একটা হোটেল খুঁজে পেল ওরা। হোটেলের নাম প্যারাডাইস গেস্ট হাউজ।ডাবল তিনটা এসি রুম পাওয়া গেল ১৭০০ রুপি করে। আসলে অন সিজন তাই ওরা সেটাই নিল। 

বিন্দু গাঁইগাঁইগুঁই করল কতক্ষন যে ও থাকবে কই। ছেলেরা এক্কটা রুমে ফ্রেশ হয়ে নিল আর মেয়েরা অন্যদুইটা রুমে৷ কিন্তু সমস্যা হল ঘুমানোর সময়। কে কই ঘুমাবে। 
আবির আর বিপ্লব গুন গুন করতে লাগল। আবির বলল,
___ " আমার নিনারে ছাড়া ঘুমে ধরে না। আমি নিনার সাথে ঘুমাবো।"

বিপ্লব যে সহসা বেশি কথা বলে না সেও করুন চোখে শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " দোস্ত কিছু একটা কর না প্লীজ।"
___ " আচ্ছা দেখছি আমি কান্না কাটি থামা "।

মুখ শুকিয়ে শিশির বলল। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে যেয়ে দেখলো বিন্দু গোসল করে বের হয়ে চুল মুছতেছে। 
ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার চুল মুছতে লাগল বিন্দু। শিশির একটু কাশি দিতেই বিন্দু ঘুরে দাঁড়ালো ওর দিকে। শিশিরের হার্টবিট কয়েকটা মিস হয়ে গেল যেন বিন্দুকে দেখে। মিষ্টি কালারের একটা লং ফ্রক পরে আছে বিন্দু একদম পুতুলের মত লাগছে মেয়েটাকে।

 ভিজা চুল স্নিগ্ধ কোমল মুখবায়। আসলেই মেয়েরা গোসল করলে এত এত সুন্দর লাগে কেন। শিশির হাঁ করে বিন্দুকে দেখতে লাগল৷ বিন্দু বলল,
___ " কি দেখছেন অমন করে "।
___ " তুমি এত সুন্দর কেন? "

মুখ ফসকে কথাটা বলেই শিশির জ্বিবা কামড় দিয়ে ধরল। বিন্দুর হাসি পেল খুব কিন্তু হাসি আটকিয়ে মুখ গোমড়া করে রইল। শিশির তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে বলল,
___ " বিন্দু একটা অনুরোধ ছিল, তুমি আমার সাথে থাকবা প্লীজ। "

এই বলে আবার জিব্বা কামড়ালো শিশির। আজকে ওর হয়েছে কি? কি কি আবোলতাবোল বলেই চলেছে। আসলে বিন্দুকে এভাবে দেখে যেন ওর মাথা কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে। শিশিরের কথা শুনে বিন্দুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আস্তে করে বলল,
___ " আমি আপনার সাথে থাকব মানে কি???"

___ " বিন্দু আমি কথা এলোমেলো করে ফেলেছি। আমি আর তুমি এক রুমে থাকি আর ওদের যার যার বউদের সাথে থাকতে দেই প্লীজ বিন্দু "।
___ " আমি আপনার সাথে এক রুমে থাকবো মানে? "

___ " এর আগেও এক রাত ছিলে তুমি আমার সাথে। খারাপ যদি হতাম তাহলে প্রথম রাতেই.......... "
___" ঠিক আছে ঠিক আছে আমার আপত্তি নেই "।
এটুকু বলেই বিন্দু.......
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১৩)

বিন্দুর রাগে শরীর ফেটে যাচ্ছিল সারা রাত এই লোকের সাথে থাকবে কি করে! কিন্তু উপায় ও তো নেই নিজেদের জন্য অন্য কাপলদের কেন কষ্ট দেবে৷ বিন্দু বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুল মুছতে লাগল। শিশির ওর ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা চলে এলো বিন্দুর রুমে। বিন্দু চোখ কুঁচকে শিশিরের দিকে তাকাতেই শিশির ঢোক গিলে বলল,

___ "কি ব্যাপার এমন করে চেয়ে আছো যেন আমি একটা তেলাপোকা "।
___ " আপনি এখনও গোসল করেন নাই?" 
বিন্দু চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করল। শিশির ব্যাগ থেকে কাপড় বের করতে করতে বলল,
___ " সালার সবাই মিলে গোসল টা করতে দিল কই আমারে? এই রুম ওই রুম করতে করতে তো সুযোগই পেলাম না গোসলের! "

___ " যান যান গোসল করে আমারে উদ্ধার করেন "।
বিন্দু ড্রেসিং টেবিলের দিকে ফিরে বলল। শিশির একদম বিন্দুর পিছনে যেয়ে টাওয়াল হাত থেকে নিয়ে নিল বিন্দুর। বিন্দু টাওয়ালের এককোনা ধরে বলল,

___ " আপনি এই টাওয়াল নিচ্ছেন কেন?"
___ " এতে যে তোমার চুলের মাতাল করা ঘ্রান আছে সেই ঘ্রানটা খুব দরকার আমার।"
শিশির ফিসফিসিয়ে বলল। বিন্দু গতি ভাল না দেখে টাওয়াল ছেড়ে দিল৷ শিশির মুচকি হেসে বলল,
___ " আমি কিন্তু সিরিয়াসই বলেছিলাম "।
___ " যতসব "।

বিন্দু নাকমুখ কুঁচকে বলল। শিশির হাসতে হাসতে শাওয়ার নিতে গেল। শিশির যখন শাওয়ার নিয়ে বের হল তখন বিন্দু খাটের পাশের ফ্লোরে বসে ওর কাপড় গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল। টাওয়াল পরা শিশিরকে দেখে ওর বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। 

ভেজা শরীরে মুক্তর দানার মত পানির ফোঁটা লেগে আছে। মাথার চুল গুলো এলোমেলো। বুকের পশমগুলো লেপ্টে আছে বুকের সাথে। হাতে পায়ের পশমগুলোও সেই মাপের লাগছে। আসলে আগে কখনও শিশিরকে এভাবে ও দেখে নি। বিন্দু যেন চোখই ফেরাতে পারছে না। হঠাৎ শিশিরের চোখে চোখ পড়লো ওর শিশির হেসে বলল,

___ " অমন করে চেয়ে থেকো না সুন্দরী প্রেমে পড়ে যাবা।" 
___ " লাজ শরম কিছুই নেই খালি গায়ে ঘুরতেছে এভাবে "।

বিন্দু মুখ বাঁকিয়ে বলল।শিশির একদম বিন্দুর সামনে এসে দাঁড়ালো বিন্দু তাড়াতাড়ি উঠতেই শিশির দেওয়ালের সাথে দুই হাত দিয়ে বিন্দুকে মাঝে রেখে আটকালো। বিন্দুর চোখে চোখ রেখে বলল,
___ " বউয়ের সামনে লজ্জা কিসের।"

বিন্দুর গাল লাল হওয়া শুরু করল লজ্জায়। শিশির বিন্দুর একদম কাছে মুখ নিয়ে এলো। বিন্দু ভয়ে দেয়ালের সাথে সেধিয়ে যেতে লাগল। শিশির হেসে বলল,

___ " জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে মজা নেই যদি সেচ্ছায় কেউ দেয় তা নেওয়ার মাঝে যে সুখ জোরে সেটা নেই। বিন্দু সত্যিই ভালবাসি তোমাকে কখনও আর ছাড়তে পারব না তোমাকে "।
___ " আমি মেনে নিলেও ফ্যামিলির কেউ মানবে না।"
___ " আমি মানিয়ে নেবো। না হয় তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। যেখানে শুধু তুমি আর আমি "।
___ " এসব তিনবছর আগে ভাবলে হয়ত আর আজকের এই দিন দেখা লাগত না "।
___ " ভুল মানুষই করে আবার সেই ভুল মানুষই শুধরায়। দেও না প্লীজ আর একটি বার সুযোগ। প্লীজ বিন্দু"।
শিশির বিন্দুর কোমরে হাত দিয়ে ওকে আরো নিজের কাছে টেনে নিয়ে এলো। বিন্দুর চোখ ছলছল করতে লাগল। ওযেন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে তবে কি ভালবাসার কাছে নিজের বিবেক হেরে যাবে। 

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়লো যেন কেন। শিশির তাড়াতাড়ি বিন্দুকে ছেড়ে দিল। বিন্দু চোখ মুছে দরজা খুলতেই দেখলো তুলি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো শিশির টাওয়াল পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। তুলি হেসে বলল,

___ " বিন্দু তোমাদের একদম মিয়া বিবির মত লাগছে। কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দেই? "
___ " ভাবি তুমিও না খালি মশকরা করো। যে যার বরের সাথে যেয়ে আমারে এই নন্দকিশোরের কাছে রেখে গেছ আর এখন মশকরা করতেছ।"

বিন্দু বিরক্ত হয়ে বলল। তখন তুলি তাড়াতাড়ি বলল,
___" রাতে বাইরে যাব না খেতে রুমেই খাব। আর কালকে ট্রেন দিল্লীর তাই তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে।"
___ " আচ্ছা ভাবী সমস্যা নেই। "

তুলি চলে যেতেই বিন্দু ঘুরে দেখলো শিশির একটা শর্টস আর টিশার্ট পরে টিভি ছেড়ে দিয়ে বসেছে। বিন্দু সোজা বাংলায় বলল, 

___ " আমি এখন ঘুমাবো টিভি বন্ধ।"
___" বাজে মাত্র ৬ টা এখনই ঘুমাবে,  তুমি ডিনার করবে না "।
তখন বিন্দু শিশিরকে বলল, তুলি কি কি বলে গেছে। শিশির ফোনে ওর আর বিন্দুর জন্য বিরিয়ানীর অর্ডার করল আরসালান থেকে। শিশির টিভি দেখতে দেখতে বলল,

___ " নেটে অনেকবার দেখেছি আরসালানের মাটন বিরিয়ানী নাকি হেব্বি টেষ্ট।"
___ " আমার এত সময় নাই যে কোথার কি টেষ্ট তা খুঁজে বেড়াবো। "

বিন্দু কাটা কাটা উওর দিল। শিশির হেসে মনে মনে বলল, আসলেই এই মেয়েকে বুঝানো মিশন ইমপসিবল এর মতই। বিরিয়ানি আসতেই ওরা খেয়ে নিল। 

এমনকি বিন্দু পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হল যে বিরিয়ানী সত্যিই টেষ্ট ছিল অনেক। পরের দিন চারটা পঞ্চাশে ওদের ট্রেন আবার ট্রেন ধরার আগে কলকাতায় বেশ কিছু কাজও আছে ওদের তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো সবাই। 

রুমে খাট একটাই কিন্তু খাট বিশাল বড়। বিন্দু খাটের এক কোনায় শুয়ে পড়লো। শিশির সিগারেট ধরাতেই বিন্দু কোন কথা না বলে সোজা শিশিরের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে ছিঁড়ে ওয়েষ্ট বাস্কেটে ফেলে দিয়ে শুয়ে পড়ল। শিশিরও কথা না বাড়িয়ে চুপ চাপ খাটের আরেক কোনায় শুয়ে পড়ল। গতকালের সারারাত থেকে আজ পর্যন্ত জার্নির কারনে এমনিতেই শরীর খুব ক্লান্ত। 

তাই শোয়ার সাথে সাথেই শিশির ঘুমিয়ে পড়লো। বিন্দু শুয়ে শুয়ে ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগল। পাশে ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝতে পারল যে শিশির ঘুমিয়েছে। ওর কম্বল শিশিরের গায়ের উপরে ভাল করে টেনে দিল। কিছুক্ষন পরে বিন্দুও শুয়ে পড়ল।
পরের দিন বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙল শিশিরের। কিন্তু হঠাৎ ঘুম ভাঙার পরে ওর কেমন জানি লাগতে লাগল। হঠাৎ টের পেল বুকের কাছে এক কোমল উষ্ণতার।

তাকিয়ে দেখে বিন্দু ওর বুকের সাথে একদম লেগে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে৷ কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন ওর হৃদপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দিল। বিন্দু শিশিরের বুকের সাথে লেগে বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে। এক মূহুর্তের জন্য মনে হল শিশিরের ও যেন স্বর্গের বাগানে আছে। 

আস্তে করে বিন্দুর পাশ থেকে সরে ঘড়ি দেখলো প্রায় বারোটার কাছাকাছি বাজে। শিশির অবাক হয়ে ভাবল এতো দুপুর হয়ে গেছে আবির বা বিপ্লব কেউ ডাকলো না কেন ওদের। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে শিশির বিন্দুকে ডাকতে লাগলো, 

___ " এই শুনছো ওঠো তাড়াতাড়ি অনেক বেলা হয়ে গেছে! " 
___  " উউউউউহু আমি আরো ঘুমাব"।

বিন্দু ঘুমু ঘুমু স্বরে বলে উঠল। বিন্দুর ওই ভয়েস শুনে শিশিরের কেমন জানি পাগল পাগল লাগতে লাগল। এখনই এখান থেকে চলে যেতে হবে ওর না হলে ঝামেলা। ও বের হয়ে আবিরদের রুমে নক করল। বেশ কিছুক্ষন পরে আবির চোখ ডলতে ডলতে বের হল। শিশির অবাক হয়ে বলল,

___ " কি রে তুই এখনও ঘুমাচ্ছিস?"
___ " এত সকাল সকাল উঠে করবটা কি? " 
অবাক হয়ে আবির শিশিরকে প্রশ্ন করল৷ শিশির আবিরের মাথায় গাট্টা দিয়ে বলল,
___ " সালা ১২ঃ১০ বাজে "।

আবির তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ভাল করে তাকিয়ে দেখলো সত্যিই এত বেলা হয়ে গেছে। আবির চলল নিনাকে ডাকতে আর শিশির গেল বিপ্লবদের রুমে। 

গত কালের জার্নির ধকলে সবাই এত মরার মত পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে। শিশির বিপ্লবকে উঠিয়ে এসে রুমে ফিরে দেখে বিন্দু তখনও ঘুমাচ্ছে। এবার শিশির বিন্দুর ঘাড়ে ধরে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল,
___ " ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমরা যাচ্ছি দিল্লী।"

একথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো বিন্দু। সবাই ফ্রেশ হয়ে পাশেই মোঘল রেস্টুরেন্ট এ চলল ব্রেকফাস্ট + লাঞ্চ করতে। মেনু দেখে সবাই কনফিউজড খাবেটা কি। পরে বিপ্লব বলল,
___ " শোন এক কাজ করি সবাই থালি সিস্টেমে খাবার নেই। এতে অনেক ভ্যারাইটি টেষ্ট করতে পারব "।
প্লান মন্দ না তাই সবাই থালি অর্ডার করল। কিন্তু অবস্থা বেগতিক কালকের মতই সব মিষ্টি মিষ্টি। নিনা মেজাজ খারাপ করে বলল,

___ " এটা মিষ্টি কুমড়ার ছক্কা না বলে মিষ্টি কুমড়ার পায়েশ বললে ভাল হত "।
___ " কিন্তু আলুর ঝুরি ভাজিটা হেব্বি মজা হয়েছে "।
তুলি আবার প্রশংসা করে বলল। বিপ্লব তখন ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল,
___ " তাড়াতাড়ি খাও ৪ঃ৫০ এ ট্রেন সে খেয়াল আছে তো "।

খাওয়া শেষে ওরা হোটেলে ফিরেই গোছ গাছ শুরু করল। হোটেল থেকে বের হতে কমলা কালারের এম্বাসেডর যেটা কি না কলকাতার ঐতিহ্য ওরা সেই ট্যাক্সি ভাড়া করল দুইটা শিয়ালদহ রেলস্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। রেল স্টেশনে আসতে আসতে প্রায় সাড়ে চারটার কাছাকাছি বেজে যায় অদের। কমলা আর ক্রিম কালারের বিশাল বিল্ডিং টাই হল শিয়ালদহ স্টেশন। 

ট্যাক্সি থেকে নেমেই ওরা চলল ট্রেনের ইনফরমেশন নিতে। দেশে থাকতেই কলকাতার পরিচিত একজন দিয়ে ট্রেনের টিকিট বুকিং দিয়েছিল আবির। বাংলাদেশের যেমন নিচতালায় টিকেট কাউন্টার কিন্তু শিয়ালদহতে তিনতালা টিকেট বুকিং কনফার্মেশন আর ইনফরমেশন কাউন্টার। 

তাই শিশির আর আবির গেল তিনতালায় খোঁজ নিতে আর বাকিরা নিচে দাঁড়ালো। ওদের ট্রেনের নাম রাজধানী এক্সপ্রেস।যেটা ডাইরেক্ট দিল্লি টু কলকাতা চলাচল করে। আর ট্রেন এক্কদম টাইমে ছিল ওদের। আবির আর শিশির ফিরতেই ওরা চলল ওদের নিদিষ্ট প্লাটফর্ম এ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ওদের ট্রেন............. 
চলবে 
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১৪)

ট্রেনে উঠেই ওরা যার যার সিট খুজতে লাগল। এসি এ ক্লাসের ছয়টা টিকিট বুকিং করা ছিল আর ট্রেনটা পুরোটাই স্লিপার কোচ তাই আর সমস্যা হল না। একপাশে চার সিট অন্য পাশে দুই সিট। সবাই যার যার ব্যাগ রেখে বসতেই বিপ্লব হতাশ হয়ে বলল,

___ " কেবিনের জন্য অনেক ট্রাই করেছিলাম রে হল না "।
___ " নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। এত পথ বাসে যাওয়া পসিবল ছিল না "।
আবির সান্ত্বনা দিয়ে বলল বিপ্লবকে। শিশিরে উপরের বাংকে উঠতে উঠতে বলল,
___ " কতক্ষন লাগবে দিল্লী পৌঁছাতে "।

___ " ট্রেন অন টাইমে থাকলে ১৭ বা ১৮ ঘন্টায় পৌঁছে যাব  দিল্লী "।
বিপ্লব টিকিট চেক করতে করতে উওর দিল। বিন্দুও পাশের উপরের বাংকে উঠতে উঠতে বলল,
___ " যতটুকু জানি রাজধানী ট্রেনটা অন টাইমেই থাকে। "
ওদের কথাই সত্যি হল। ট্রেনটা ঠিক ৪ঃ৫০ এ প্লাটফর্ম ছাড়ল। ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথেই ওদের বিকালের নাস্তা দেওয়া হল। 

সবাইকে এক একটা ট্রেতে এক প্যাকেট ডাল ভাজা,একটা মাফিন কেক এক প্যাকেট ছোট একটা কচুরী যেটা অনেকটা দেখতে বাংলাদেশের পুরির মত আর চায়ের জিনিস পত্র।
 
বিন্দু আর শিশির নিচে নেমে এসে জানলার পাশে বসে বসে চা আর নাস্তা খেতে লাগল। বাইরের সূর্যটা তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে  অস্ত যাচ্ছে। পৃথিবীটা যেন দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণে এসে ডুবন্ত সূর্যের লাল আলোয় রক্তিম হয়ে উঠছে। 

এমন সময় চায়ের কাপ হাতে প্রিয়জনের সাথে বাইরের দৃশ্য অবলোকন করার মত মধুর জিনিস বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই। শিশির কতক্ষন ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে দেখছে কতক্ষন বিন্দুর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। 

ওর যে কি লাগছে ও যেন বুঝাতেই পারছে না।  সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত গেল বাইরে অন্ধকার হয়ে আসলে ওরা সবাই বসল গল্প করতে। নিনা আবিরের কাছে বলল,

___ " কত করে পড়েছে তোমার এই ডাব্বার ভাড়া? "
___ " ডাব্বা কও আর আব্বা কও কত সুন্দর দেখেছ সাথে তিনবেলা খাবারও দিচ্ছে। "
আবির ফোঁড়ন কেটে বলল। বিন্দু হেসে নিনাকে বলল,
___ " ভাবি মে বি ১৭০০ রুপি করে পড়েছে পার পারসোন খাওয়া সহ।"
___ " এত টাকা? "

নিনা চোখ বড় বড় করে বলল। তখন তুলি বলল,
___ " তিনবেলা খাওয়া দিচ্ছে নাস্তা দিচ্ছে সব মিলিয়ে কমই তো "।

শিশির তখন বলল,
___ " বিয়ের পরে হানিমুনে যাওয়ার জন্য বেষ্ট উপায় হল ট্রেন। "
___ " গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। বিয়েরই খবর নাই উনি আছেন হানিমুনে যাওয়ার তালে "।

বিন্দু মুখ বাঁকিয়ে বলল। শিশির তখন ঘুরে বিন্দুর দিকে তাকালো। মোটামুটি একদম বিন্দুর মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

___ " বিয়ে করতে সবাই পারে কিন্তু মনটা জয় করতে কয়জনে পারে? বিয়ের আগে মনটাকে জয় করে নিজের করে নিতে চাই"।

এই বলে বিন্দুর দিকে তাকিয়ে ও চোখ টিপ দিল। তুলি আর নিনা হাসতে হাসতে হাত তালি দিল জোরে জোরে। আবির হাসতে হাসতে বলল,

___ " তিনবছর ডেনমার্ক থাইক্কা দোস্ত আমার প্রেমের উপরে পি এইচ ডি করছে রে!"
বিন্দু গাল লাল টকটকে হয়ে গেল। এত লজ্জা আগে কখনও পায় নি ও। শিশির ওর গালের দিকে চেয়ে বলল,

___ " থাক থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। যে পরিমান লাল হয়েছে কখন জানি টাস করে ফেটে যায় গালটা।তখন আরেক বিপদ।"

শিশিরের কথা শুনে আরেক চোট হাসির বন্যা বয়ে গেল। অন্যান্যরা ওদের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল ছয়টা ছেলে মেয়ে কতটা আনন্দের সাথে তাদের জার্নি করছে। আড্ডা দিতে দিতে রাতের খাবার চলে এলো। নিনা নাক সিটকিয়ে বলল,
___ " আবার সেই চিনি দেওয়া তারকারি"।

___ " আরে আগে খেয়ে তো দেখবে নাকি? "
আবির বিরক্ত হয়ে বলল। শিশির আর বিন্দু এক সিটে,নিনা আর আবির এক সিটে আর বিপ্লব তুলি ওরা এক সিটে। 

এমন করে জোড়ায় জোড়ায় খেতে বসল। ছোট ছোট বক্সে ফয়েল পেপার মোড়ানো গরম গরম খাবার। ওরা সবাই নন ভেজ নিয়েছিল তাই দুটো করে রুটি,ভাত সবজি, চিকেন মাসালা আর ডাল। হেব্বি খাওয়া যাকে বলে। 

যে নিনা ইন্ডিয়ান খাবার একদমই পছন্দ করে না সে পর্যন্ত তারিফ করতে বাধ্য হল। খাওয়া শেষে সবাই আর কিছুক্ষন গল্প করে যে যার জায়গায় গেল ঘুমাতে। 

শিশির আর বিন্দু উপরের বাংকে শুয়েছিল পাশাপাশি। বিন্দু মাথার কাছের লাইট জ্বালিয়ে বই মেলে শুতেই শিশিরের মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি আসলো। শিশির মেসেঞ্জারে মেসেজ দিল বিন্দুকে,
___ " এত শীতেও বুঝি কারো নাক ঘামায়? "

ম্যাসেজের শব্দে বিন্দু বই রেখে ফোন হাতে নিয়ে দেখল শিশিরের মেসেজ। চোখ গরম করে শিশিরের দিকে তাকাতেই শিশির দেখেও না দেখার ভাব করল। বিন্দু মেজাজ খারাপ করে ঊওর দিল মেসেঞ্জারে,
___ " নাক ঘামলে আপনার কি?  "
___ " নাক ঘামলে আমারই লাভ! "
___ " কি লাভ শুনি একটু? "

___, " যাদের বেশি নাক ঘামে তাদের জামাই তাদের বেশি আদর করে "।
শিশিরের রিপ্লাই পেয়ে বিন্দু চোখ বড় বড় করে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। না পেরে একটা রাগের ইমোজি দিয়ে নেট অফ করে শুয়ে রইল। শিশির ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে হেডফোন কানে গুজে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। 

বেশ কিছুক্ষন পরে শিশির কাজ সেরে যখন ল্যাপটপ বন্ধ করল তখন পাশের বাথে চেয়ে দেখে আবছা আলোতে বইটাকে বুকের উপর রেখেই মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। কোথায় যেন পড়েছিল
কাউকে ঘুমালে নাকি অসম্ভব সুন্দর লাগে। আর মেয়েদের তো আরো বেশি। বিন্দুকে এত এত কিউট লাগছিল যে বলার মত না। একগুচ্ছ চুল এসে পড়েছে মুখের উপরে। 

গলা পর্যন্ত কম্বল টানা হাত একটা বের করে রাখা। শিশিরে মনে হল হাতটা একটু ভেতরে ঠেলে দিলে ভাল হত। না হয় হাতটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। কোন মতে একটু টানা দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল বিন্দুর হাতটা কম্বলের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য। 

কিন্তু দুই বাথের মাঝে অনেক ফারাক ইচ্ছা করলেও পারছে না যেই শরীরটা একটু ছেড়ে বিন্দুর হাত ঢুকেতে গেল অমনি ধুড়ুস করে নিচে পড়ল শিশির। পড়বি তো পড় সামনের বাথের নিচে ঘুমিয়েছিল আবির একদম ওর বুকের উপরে পড়ল যেয়ে ও। 

আবির গভীর ঘুমে ছিল শিশির বুকের উপর পড়তেই ও হুক করে একটা শব্দ করেই চেঁচিয়ে উঠলো। বাবা গো মা গো বলে স্বশব্দে চেঁচিয়ে উঠলো। 
রাতের বেলায় সবাই ঘুম ছিল সাতগে সাথে লাইট জ্বলে উঠলো। আবির তখনও কাঁতরাচ্ছে। শিশির বলল,
___ " দোস্ত বুঝতে পারি নি পড়ে গেছি"!

___ " ওরে বুকে হাড্ডি সব গুঁড়ি হয়ে গেছে। এই গুঁড়ি দিয়ে পিঠা বানায়ে খাওয়া যাবে!"
আবির কাতরাতে কাতরাতে বলল। বিপ্লব ওর কথা বাদ দিয়ে শিশিরকে বলল,
___ " শিশির  তুই নিচের বার্থে ঘুমা। যদি আবার পড়িস "।

শিশির তখন কাউকে বুঝাতেই পারছে না যে কেন ও পড়েছে। বিন্দু মাথা নিচু করে নিচের কাহিনী দেখছে। পরে সব শান্ত হলে আবার যে যার জায়গায় চলে গেল ঘুমাতে। 
শিশিরের মনে মনে নিচের চুল নিজেই ছিঁড়তে লাগল। এমন করতে করতে ঘুমের রাজ্যে কখন যে হারালো  সেটা নিজেও জানে না।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাংতেই দেখে বিন্দু নেই পাশের বার্থে। তাড়াতাড়ি নিচে তাকিয়ে দেখে সবাই উঠে পড়েছে। বিন্দু চোখে চশমা দিয়ে পেপার দেখছে ইংরেজি পত্রিকা। 

শিশির কিছু না বলে নিচে নেমে ফ্রেশ হয়ে নিল। মুখ মুছতে মুছতে সিটে বসতেই আবির চোখ মুখ অন্ধকার করে বলল,
___ " বনের রাজা টারজান এসেছে "।

শিশির কিছু না বলেই আরেকটা পেপারে চোখ বুলাতে লাগল। বিন্দু আড় চোখে শিশিরের দিকে তাকিয়ে দেখলো শিশির পেপারের আড়াল থেকে ওকে দেখছে। বিন্দু তুলির দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " ভাবি পেপারের অক্ষর কি আমার মুখে ফুটেছে নাকি?"

তুলি অবাক হয়ে বলল,
___ " মানে কি? "
শিশির বিন্দুর কথা শুনে তাড়াতাড়ি পেপার দিয়ে নিজের মুখ ডাকলো। এর একটু পরেই নাস্তা দিয়ে গেল সকালের। 

পাউরুটি ডিমের অমলেট আর চা আর সাথে চকলেট। শিশির বিন্দুকে চকলেটটা দিতেই বিন্দুও বাচ্চাদের মত চকলেটটা নিয়ে নিল। এটা দেখে শিশির হেসেই ফেলল। 

খাওয়া শেষে আধাঘন্টা পরই ট্রেন চলে এলো দিল্লির পাহাড়গঞ্জ স্টেশনে। ওরা সবাই নেমে পড়লো তারপর মেইনগেট থেকে বেরিয়ে ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে  দুটো ট্যাক্সি নিল পাহাড়গঞ্জের কাছেই আরাকাশন রোড়ে যাওয়ার জন্য। 

ওখানে হোটের আউরাতে ওরা চারটা রুমের বুকিং আগেই দিয়ে রেখেছিল। এখানে ওরা দুটো ডাবল রুম বুকিং দিয়েছিল ২৫০০ রুপি করে আর দুটো সিঙেল রুম ১৫০০ রুপি করে। হোটেলে চেকিং করেই সবাই যে যার রুমে চলে গেল। 

শিশির নিজের রুমে ঢুকেই আগে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিল। কেন জানি না ওর খুব ইচ্ছা করছিল বিন্দুকে এক নজর দেখার কিন্তু কি বলে যাবে বিন্দুর কাছে। ঠিক এমন সময়.........
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১৫)

ঠিক এমন সময় দরজা নক করল কে জানি। শিশির টাওয়ালের উপরে টিশার্ট পরে দরজা খুলেই দেখলো সামনে বিন্দু দাঁড়ানো। শিশিরের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এ কি সম্ভব? বিন্দু প্রথমে শুরু করল কথা,
___ " আপনার সাথে আমার ফোনের চার্জার একচেঞ্জ হয়ে গেছে।"
___ " কই না তো "।

শিশির প্রতিবাদ করল। বিন্দু হঠাৎ শিশিরের হাত থাবা দিতে ধরে হাতের উপরে চার্জার রেখে বলল,
___ " তাহলে এটা কার চার্জার? "

শিশির ভাল করে তাকিয়ে দেখে যে এটা ওরই চার্জার। এখন আর কথাই খুঁজে পাচ্ছে না ও। বিন্দু কোন মতে হাসি আটকে রেখে বলল,

___ " যান যেয়ে আমার চার্জারটা দেন "।
শিশির তড়িঘড়ি করে চার্জারটা এনে বিন্দুর হাতে দিল। বিন্দু ঘুরে চলে যাচ্ছিল এমন সময় শিশির পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল,
___ " শাওয়ার নেও নি তুমি? "

___ " হঠাৎ আমার শাওয়ার নিয়ে পড়লেন কেন আপনি?"
শিশির মনে মনে বলতে লাগল, " ভেজা ওই চোখ মুখটা যে বড়ই সুন্দর লাগে তাই বারেবার দেখতে চাই"। বিন্দু আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল ওর রুমে। 

শিশির দরজাটা লক করেই সোজা বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়লো। মেয়েটা এত কিউট কেন সেটাই ওর মাথায় ধরে না। একেই বুঝি ভালবাসা কয়। 

সবাই ফ্রেশ হয়ে চলল বাইরে খেতে। নিচের লবিতে আবির আর বিপ্লব দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। শিশিরকে আসতে দেখেই দুজনেই হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। শিশির কাছে এসে ওদের দুজনকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
___ " কি রে তোরা এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? "
আবির ঢোক গিলে বলল,

___, " দোস্ত আজ জীবনে প্রথম আফসোস হচ্ছে মেয়ে হলাম না কেন। মেয়ে হলে সোজা তোকে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করে বসতাম। সেই মাপের হ্যান্ডসাম লাগছে তোকে।"
সত্যিই সাদা টিশার্ট আর কালো ব্লেজারে শিশিরকে এক কথায় অসাধারণ দেখাচ্ছিল। বিপ্লব হেসে বলল,
___ " আজকে বিন্দু হ্যাঁ বলেই ছাড়বে দেখিস।"

ওরা তিন বন্ধু মিলে হাসাহাসি করছি এমন সময় তুলি নিনা আর বিন্দু নেমে এলো নিচে। সাদা কালো থ্রিপিসে বিন্দুকে যেন অন্যরকম লাগছে। বিন্দু আড়চোখে শিশিরের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল সত্যিই আজ শিশিরকে অসাধারণ লাগছে। 

সবাই মিলে আরাকাশন রোডের নবাব বিরিয়ানিতে চলল খেতে। প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে একেবারে লাঞ্চ করে বের হবে ওরা। আজ বিপ্লব আর আবিরের প্রচুর কাজ। তাই ওরা বেরিয়ে যাবে খেয়েই৷ 

খাওয়াদাওয়া হাসাহাসি সব চলল। খাওয়ার পরে মেয়েরা গেল হোটেলে আর শিশির গেল ওর বন্ধুদের সাথে। সারাদিন কাজের পরে রাত সাড়ে নয়টার দিকে ওদের কাজ শেষ করে ওরা চলে এলো হোটেলে। 
রাতে খেয়ে যার যার মত শুয়ে পড়ল কারন পরদিন এক বিশাল শিডিউল আছে ওদের। শিশির সারাদিন উষ্কখুষ্ক করেছে বিন্দুকে দেখার জন্য।এসেও বিন্দুকে দেখতে পায় নি। 

কারন বিন্দু আগেই খেয়ে শুয়ে পড়েছিল। সবাই শুয়ে পড়লে শিশির ধীরে ধীরে বিন্দুর  রুমের দরজায় নক করে। 

বিন্দু যেন শিশিরের অপেক্ষাতেই ছিল। দরজা নক করার সাথে সাথেই খুলে দিল।কিছু না বলে আস্তে করে সরে দাঁড়ালো দরজা থেকে। শিশির চুপ করে বিন্দুর খাটের উপরে যেয়ে বসতেই বিন্দু চেয়ার টেনে ওর সামনে বসল।

শিশির হঠাৎ ওর সামনের ফ্লোরে বসে বিন্দুর হাতটা জড়িয়ে ধরল। আজ যেন শিশিরের চোখের মেঘ গুলো বর্ষনের রুপ ধারন করল। বিন্দুর হাতটা ওর হাতের মধ্যে নিয়ে অঝোরে বাচ্চাদের মত কাঁদতে কাঁদতে বলল,

___ " বিন্দু আমি তো আর পারছি না। আর দূরে রেখো না আমাকে। আমার তো আর সহ্য হচ্ছে না বিন্দু প্লীজ আমাকে ক্ষমা করে দেও"।

____ " পারবেন গত তিন বছরের অসহ্য যন্ত্রণাগুলো মুছে দিতে। পারবেন আমার আর আপনার ফ্যামিলির উপরে মানুষের অভিযোগ গুলো ফিরিয়ে দিতে।

পারবেন না তাহলে কেন ক্ষমা চাইছেন? আছি তো ভাল আপনিও ভাল আছেন তাহলে কেন এত অনুযোগ। "

বিন্দু কাঠের মত উওর দিল। শিশির কিছু না বলে বিন্দুর হাতে মাথা দিয়ে কাঁদতে লাগল। ওর কাছে কিছুই যে বলার নেই আজ। বিন্দু যেন বুকটা ফেটে যাচ্ছে আজ পারছে না যেন নিজের সাথে। 

শিশিরকে এভাবে কাঁদতে দেখে বিন্দু যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। শিশির উঠে দাঁড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। শিশির দরজার কাছে পৌঁছে দরজা খুলবে এমন সময় বিন্দু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শিশিরকে।

 প্রত্থম কিছু মূহুর্তে শিশির যেন বুঝে উঠতে পারল না হচ্ছেটা কি। পরে যখন বুঝলো যে এটা বিন্দু ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না। শিশির ঘুরে বিন্দুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল,
___ " মাফ করে দেও আমাকে আর কখনও ছেড়ে যাব না তোমাকে "।
___ " এই বার ছেড়ে গেলে সোজা মরে যাব আমি "।

শিশির আর কিছু না বলে সজোরে জড়িয়ে ধরল বিন্দুকে। বুকের উপর থেকে বিশাল এক পাথর যেন নেমে গেল শিশিরের। কতক্ষন এভাবে থাকার পরে শিশির বিন্দুর মুখ উঁচু করে ধরে বলল,
___ " বিয়ে করবে আমাকে আজ এখন? "
___ " মানে কি? "
বিন্দু অবাক হয়ে বলল। শিশির ওর চোখে চোখ রেখে বলল,
___ " হ্যাঁ বা না "।

___ " আমাদের দুইজনের বাসার কেউ মেনে নেবে না "।
___ " বিন্দু আমি জানি তুমি আমাকে ভালবাসো না হলে এই তিনবছর একা থাকতে না৷ আর কষ্ট দিও না আমাকে।"
___ " কিন্তু......"

___ " কোন কিন্তু নয় বিন্দু আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না "।
বিন্দু কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল। শিশির কল দিল আবিরকে। আবির বেশ কিছুক্ষন পরে ফোন ধরে বিরক্তির স্বরে বলল,

___ " তোর না হয় বউ নাই আমার তো আছে। এমন এমন সময় ফোন দিস না তুই........  সে যাই হোক বল কল দিছিস কেন? "
___ " আবির আমি বিয়ে করব এক্ষুনি "।

___ " সালা তুই কি মদ গাঞ্জা খাইছিস নাকি কিছু? কি কি বলতেছিস তুই  বিয়ে করবি মানে? "
___ " আমি সিরিয়াস আমি বিয়ে করব ''।

আবির নিনাকে গায়ের উপর থেকে সরিয়ে উঠে বসল।ভাল করে মাথা ঝাড়া দিয়ে বলল,
___ " একবার বিন্দুকে কষ্ট দিয়েছিস আবার এখন আরেক মেয়েকে বিয়ে করে বিন্দুকে কষ্ট দিবি?"
___ " " আমি বিন্দুকেই বিয়ে করব। তাও আবার এক্ষুনি!"
এবার আবিরের মুখ হাঁ হয়ে গেল। নিনা আবিরের অবস্থা দেখে বলল,
___ " কি ব্যাপার তুমি এমন করছ কেন? কি হইছে? "

___ " নির্ঘাত শিশির গাঞ্জা খাইছে তাও আবার ডেট ওভার গাঞ্জা কি কি বলতেছে ও "।
নিনা কিছু বলতে যাবে এমন সময় শিশির ফোনের অপর পাশ থেকে বলতে লাগল,
___ " তুই বিপ্লবকে নিয়ে বিন্দুর রুমে চলে আয়। আমি অপেক্ষা করতেছি"।

এই বলেই শিশির ফোন কেটে দিল। আবির কিছুক্ষন হতবিহবল হয়ে বসে রইল। পরে বিপ্লবকে নিয়ে ওর রুমে যেতেই বিন্দু এক কোনায় চুপ হয়ে বসে আছে আর শিশির অস্থির ভাবে পায়েচারী করছে। 
সব শুনে ওই রাতেই ওরা একজন কাজী ধরে নিয়ে আসে হোটেলের লোকদের সহযোগীতায়। যেহেতু ইন্ডিয়াতে আছে তাই আর রেজিষ্ট্রি করাতে পারলো না। 

শুধু কলমা পড়ে ১০ লাখ টাকা মোহরানা ধার্য্য করে ওদের বিয়ে হয়ে গেল। সবাই মিষ্টি মুখ সেরে যখন চলে গেল। আবির বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " দোস্ত আমারে একটা চিমটি দেতো। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এদের দুইটার বিয়ে হয়ে গেছে। "
___ " দে তোর হাত দে চিমটি দেই "।

বিপ্লব হাসতে হাসতে বলল। আবির তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিল৷ তখন তুলি হেসে বলল,
___ " তো নতুন বউকে সাজিয়ে দেই আজকে ওদের বাসর রাত তো "।

___ " রাত বাজে দুইটা আর আছেই কয়েক ঘন্টা। সকাল সাড়ে সাতটায় গাড়ি আসবে খেয়াল আছে। "
আবির তুলিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো। শিশির এতক্ষন চুপ ছিল ও হঠাৎ বলে উঠলো,
___ " বিয়েটা করলাম বিন্দুকে বেঁধে রাখার জন্য। বাসর আর সংসার দেশে যেয়েই শুরু করব। "

এই বলে ও বেরিয়ে গেল রুম থেকে।সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শিশিরের যাওয়ার পথে দিকে চেয়ে। বিন্দুর ঠোঁটের কোনায় হঠাৎ একটা হাসি ফুটে উঠলো।

 এ যেন শিশিরকে অন্য দৃষ্টিতে দেখার প্রতিচ্ছবি। সেদিন সারারাত দুটো মানুষ পাশাপাশি রুমে শুয়ে জেগে থাকলো। কাছে যাওয়ার কোন বাঁধা নেই,  নেই কোন বারন তাও দুজন মানুষ এক হয়েও আজ আলাদা। এমন বাসর বোধ হয় এই প্রথম কারো হল।

পরের দিন সকালে সবাই নিচে এসে হাজির হল। আজকে সারাদিন ওরা আগ্রার তাজমহল দিল্লী ফোর্ট এসব ঘুরে রাত্র ১০ টায় জম্মুর ট্রেন ধরবে। একটা দশ সিটের মাইক্রোবাস ভাড়া করেছে ওরা। 

সারাদিন ওটাতেই জার্নি করে রাতে  রেল স্টেশনে দিয়ে আসবে ওদের। ১১০০০ রুপির চুক্তি। ওর হোটেলে চেক আউট করে একেবারে ব্যাগেজ সহ বের হয়ে আসলো। দিল্লী থেকে আগ্রা প্রায় ২২০ কিঃমিঃ। 

সোজা একটা ফোর লেনের হাইওয়ে আছে দিল্লি থেকে আগ্রা যাওয়ার যেটার নাম যমুনা এক্সপ্রেস হাইওয়ে। 

যে শিশির ইউরোপ থেকে এসেছে সেও প্রশংসা করল এই রাস্তার।খুব সুন্দর স্মুথ একটা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে আগ্রা যেতে প্রায় আড়াই ঘন্টা লাগে। বিন্দু গাড়িতে উঠে শিশিরের কাধে মাথা দিয়ে রইল চুপ করে। 
শিশিরে বিন্দুর কোমর জড়িয়ে ধরে আরো কাছে নিয়ে আসলো। 

রাস্তার দু ধারে দেখার মত কিছু নেই। কেমন  জানি মরুভূমি টাইপের। মাঝে মাঝে কিছু হাই রাইজড বিল্ডিং এই আর কি। 

ওরা সকালে নাস্তা করে আসে নাই তাই ড্রাইভারকে বলল,রাস্তার পাশের কোন রেস্টুরেন্টে থামাতে। রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টগুলোকে এখানে ধাবা বলা হয়। তেমনি একটা ধাবায় ওদের ড্রাইভার গাড়ি থামালো। 

ধাবাটার নাম শিবা ধাবা। ওখানে ওরা আলু পরাটা চা আর হালকা আরো কিছু খেয়ে আবার রওনা দিল। গাড়িতে উঠেই শিশির আস্তে আস্তে বিন্দুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। বিন্দু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল.........

চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

শিশিরের বিন্দু-পার্ট-(১৬)

বিন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
__" কি ব্যাপার এমন করে ধরে আছেন যেন কোথাও চলে যাচ্ছি?"
___ " চলে যেতে দিলে তো "।

শিশির মুচকি হেসে বলল। বিন্দু শিশিরের কাধে আবারো মাথা দিল। আবির পেছনে তাকিয়ে শিশিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
___ " মাঝে মাঝে ভাবি তুই আর কত কি দেখাবি যে শিশির "।
শিশির কিছু বলার আগেই বিপ্লব বলল,
___ " শিশির আবার কি কি দেখালো তোরে? "

বাকি সবার প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকালো আবিরের দিকে। তখন আবির বলতে লাগল,
___ " প্রথমে গায়ে হলুদের দিনে পলাইলো তারপর দেশে আইসা সেই মেয়েই ইন্ডিয়া বইসা এক রাতের মধ্যে বিয়া করল। আর কিছু শুনতে চাস?"

আবিরের কথা বলার ধরনে সবাই হেসে উঠলো। বিন্দু লজ্জায় লাল হতে লাগল ধীরে ধীরে। ওরা এসে পৌঁছালো তাজমহলের কাছে। তাজমহলের থেকে বেশ কিছু দূরেই ওদের গাড়ি থামিয়ে দিল। কারণ এখান থেকে আর কোন বড় গাড়িই যেতে দেয় না। 

সবাই গাড়ি থেকে নেমে অটোতে ১০ রুপি করে তাজমহল পর্যন্ত গেল। শিশির আর আবির গেল টিকিট কাটতে। বাইরের চার্টে লেখা যারা ইন্ডিয়ান তাদের টিকিট মূল্য ৫০ রুপি। যারা সার্কভুক্ত দেশের অধিবাসী তাদের জন্য ৫৪০ রুপি আর অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য ১১০০ রুপি প্রতি টিকিটের মূল্য। আবির ফিসফিসিয়ে শিশিরকে বলল,

___ " দোস্ত দুই একটা হিন্দি বলে নিজেরে ইন্ডিয়ান কইয়া চালান দিয়ে টিকিট কেটে আন।"
___ " পরে যখন ধরা পড়বো তখন বাপ বাপ ডেকেও কুল পাবো না "।

শিশির চোখ গরম করে বলল। সত্যিই শিশিরের ধারনাই ঠিক হল টিকিট কাটার সময় ইন্ডিয়ানদের রেশন কার্ড বা আধার কার্ড শো করা লাগছিল। ওদেরও টিকিট কাটার সময় পাসপোর্ট শো করা লাগল। 

ছয়টা টিকিট কেটে ওরা যখন ফিরছিল তখন হঠাৎ করেই টিকিট কাউন্টারের পাশে দেখলো একটা লোক টিকিট দেখে দেখে পানি আর সাদা সাদা কি যেন একটা দিচ্ছে। আবির এগোতেই দেখলো এখানে তাজমহলের টিকিট দেখিয়ে এক বোতল পানি আর জুতার উপরে পরার কভার পাওয়া যায়।
 
কারন তাজমহলে জুতা পরে যাওয়ার সিস্টেম নাই হয় জুতা খুলতে হবে না হয় জুতার উপরে কভার পরে নিতে হবে৷ শিশির আর আবির এসব নিয়ে এলে অন্য সবাই অবাক হয়ে রইল। আসলে ওরা কেউই জানতনা যে তাজমহলে এমন সিস্টেম আছে৷ 

শিশির এসে বিন্দুর হাত ধরল। দুজনে ধীরে ধীরে তাজমহলে ঢোকার গেটের দিকে যেতে লাগল। চেকিং স্ক্যানিং এর পরে যখন ওরা ঢুকলো তাজমহলের গেটের ভিতরে তখনও তাজমহল বেশখানিকটা দূরে।
 
ওরা সবাই আস্তে আস্তে তাজমহলের মেইন গেটের দিকে যেতে লাগল৷ প্রথম যখন শিশির তাজমহল দেখলো যেন ক্ষনিকের জন্য থেমে গেল। বিন্দু নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল তাজমহলের প্রথম দর্শনেই। 
একটা পাথরের ইমারত ভালবাসার প্রতীক হয়ে গেছে তাও শত শত বছর আগ থেকে। শিশিরের মুখ থেকে একটা শব্দই বের হল, " অসাধারণ "।

এতদিন বইয়ের পাতায়,ছবিতে, ভিডিওতেই তাজমহল দেখেছে বিন্দু। কিন্তু ওর বারবার মনে হচ্ছে তাজমহলের আসল সৌন্দর্যের ১০ ভাগ ও বোঝা যায় না এসবের। নিজেকে যেন ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে এই তাজের সামনে। 

ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল তাজমহলের দিকে। নিনা হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে তাজমহল দেখছে। হঠাৎ আবিরের দিকে তাকিয়ে  বলল,

___ " দেখেছ শাহজাহান তার বউরে কি পরিমাণ ভাল টাই না বাসতো। আস্ত একটা তাজমহল বানায়ে দিছে বউটারে। আর তুমি......  আমি সামান্য একটু শপিং করলেই আমার সাথে কাউ কাউ শুরু কর।"
আবির জোর করে হেসে বলল,

___ " জান প্রথম কথা হল শাহজাহানের আব্বা ওরফে মমতাজের শশুর আব্বা বাদশাহ আছিল। কিন্তু কপাল খারাপ তোমার শশুর আব্বা পানি উন্নয়ন বোর্ডে বইসা পানির উন্নয়নে ব্যস্ত। দ্বিতীয় কথা হল মমতাজ আফা মরার পরে শাহজাহান দুলাভাই এইডা বানাইছিল তাই......... "।

___ " কি?  তুমি আমারে মরতে বলতেছ?  তুমি কি ভাবছো আমি বুঝি না, আমি মরলেই আরেকটা বিয়া করবা তাই না "।

___ " না বউ তুমি মরলে আমি তোমার কবরের পাশে টেবিল ফ্যান ফিট করে দেবো। "
___ " কেন কেন?  টেবিল ফ্যান ফিট করবা কেন?"

___ " যেন কবরের মাটি তাড়াতাড়ি শুকায়। আমাদের মধ্যে নিয়ম আছে বউয়ের কবরের মাটি না শুকালে বর আরেকটা বিয়ে করতে পারে না "।

এটুকু বলার পরেই নিনা ব্যাগ উঁচু করে আবিরকে মারতে দৌড়ালো। আবিরও দৌড় শুরু করল। শিশির আর বিন্দু হাসতে লাগল ওদের অবস্থা দেখে। 

তাজমহলের প্রধান বিল্ডিংয়ে ঢুকতেও ওদের আরেক প্রস্ত চেক করা হল। এটা আরো কঠিন ভাবে চেক। তাজমহলের বেদীর উপরে উঠে শিশির বিন্দুর হাত ধরে নিয়ে চলল যমুনা নদী যে পাশে ঠিক সেই পাশটাতে। 
আবির আর নিনা চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ শিশির হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বিন্দুর সামনে। তাজমহলের অন্যান্য যে দর্শনার্থীরা রয়েছিল তারাও দাঁড়িয়ে পড়ে। 

বিন্দু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে  রইল শিশিরের দিকে। বিপ্লব আর তুলি ছুটে এসে দাঁড়ালো ওদের পাশে। শিশির হাতে একটা আংটি নিয়ে বিন্দুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
___ " তাজমহল আর তার যমুনাকে সামনে রেখে বলছি সারা জীবন আমাকে সামলানোর জন্য আমার পাগলামী গুলো সওয়ার জন্য আর আমাকে এত এত ভালবাসার জন্য একটা তুমি চাই। হবে আমার সেই তুমিটা? "

বিন্দুর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াতে লাগল। ও নিচু হয়ে শিশিরের গলা আকড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ততক্ষনে ওদের চারপাশে ছোটখাটো একটা ভিড়  জমে গেছে। তারা সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলো।মাথায় পাগড়ি দেওয়া এক শিখ ভদ্রলোক বলল,

___ " বিবি জি হ্যা কার দিয়া বহুত আচ্ছা বাত হ্যায়। আব জালদি ছে সাদি কার লি জিয়ে। "
___ " ও দোনো পতি পত্নি হ্যা সরদারজি "।

বিপ্লব হাসতে হাসতে বলল। তখন সেই শিখ ভদ্রলোক অবাক হয়ে বলল,
___ " কিয়া বোল রাহা হো?  আগার ইয়ে পতি পত্নি হ্যা তো প্রপোজ কিউ কার রাহা হ্যা"।
___ " নয়া নয়া পেয়ার হ্যায় ইস লিয়ে। "
___ " ভাই গুরু ইস জামানাকে বাচ্চালোক বহুত ক্রিটিকাল হ্যায় "।

তার কথা শুনে সবাই হাসতে লাগল। বিন্দুর হাতে আংটি পরিয়ে দিয়ে শিশির চলল তাজমহলের ভেতরটা দেখতে। এত বড় একটা তাজমহলের ভেতরে বিশাল একটা ঝাঝরি ওয়ালা নেটের মত দিয়ে ঘেরা। 
ওর মধ্যে মমতাজ মহলের কবর। একদম ঠিক তাজমহলের মাঝ খানে উনার কবরটা। এত ছিমছাম আর এত নিখুঁত কারুকার্য যে পাথর কুঁদে করা যায় সেটা জানা ছিল না। 

বিন্দু বারবার পিছ ঘুরে ঘুরে দেখছিল তাজমহলকে। আজ যে এই তাজের সাথে ওর ভালবাসাটাও জুড়ে গেল।
তাজমহল থেকে আগ্রা ফোর্ট মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে। 

ওরা একটা অটো ভাড়া করল পঞ্চাশ রুপি দিয়ে আগ্রা ফোর্ট যাওয়ার জন্য। বিন্দু সবার কাছ থেকে আগেই তাজমহলের টিকিটটা নিয়ে নিয়েছি সংগ্রহ করে রাখবে বলে। পরে যখন ওরা আগ্রা ফোর্টে ঢোকার জন্য টিকিট কিনতে গেল তখন শুনতে পেল এমনিতে এন্ট্রি ফি আশি রুপি কিন্তু তাজমহলের টিকিট শো করলে ৪০ রুপিতেই টিকিট পাওয়া যায়।

 ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে শিশির বিন্দুকে বলল,
___ " দেখেছ এটা অনেকটা আমাদের লাল বাগের কেল্লার মত।"
___ " আমার কাছেও এমনই মনে হচ্ছিল।"

বিন্দু চারপাশ দেখতে দেখতে উওর দিল। আগ্রা ফোর্ট দেখতে দেখতে ওদের বিকাল হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে ওরা আবার গাড়িতে ব্যাক করল। কারণ রাত ১০ টায় ওদের জম্মুর ট্রেন। 
সারাদিনের ঘোরা ঘুরিতে সবাই প্রচুর টায়ার্ড। তাই গাড়ি ছাড়ার সাতগে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল প্রায় সবাই।বিন্দু শিশিরের কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। নিনা আর আবির মাথা ঠোকাঠুকি করে ঘুম। 

বিপ্লবের কাধে মাথা দিয়ে তুলি ঘুমাচ্ছে আর বিপ্লব গেম খেলছে ফোনে। শিশির অবাক হয়ে বিন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।এই মেয়েটা ঘুমালে এত এত কিউট কেন যে লাগে। হঠাৎ শিশিরের চোখ পড়লো বিন্দুর ঠোঁটের দিকে। কমলার কোয়ার মত ঠোঁট জোড়া। নিচের ঠোঁটটা একটু ভেতরের দিকে ঢোকানো। শিশিরের খুব লোভ হতে লাগল ওই ঠোঁট জোড়ার উপরে। 

তাড়াতাড়ি বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল ও। মনে মনে শিশির হাসতে লাগল আর ভাবতে লাগল, বিয়ে করা বউ তাও এত এত ভয় পাচ্ছে কেন ও। বিশাল এক ট্রাফিকে পড়ল ওরা দিল্লি শহরে ঢোকার মুখে। বিপ্লব শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___ " দোস্ত ট্রেন না মিস করে বসি।"

শিশিরের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়লো। দিল্লীর সোনাইরহিলা স্টেশনে ওরা যখন পৌঁছালো তখন ঘড়ির কাটায় ঠিক সাড়ে নয়টা। এবার দিল্লি থেকে জম্মু যাবে ওরা দুরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে৷ 

গতবার রাজধানী এক্সপ্রেসে ওরা এসি টু টায়ারে এসেছিল তাই এবার ওরা এসি কেবিন বুক করেছে। ট্রেনে উঠেই শিশির আর বিন্দু অবাক। কারন ওদের জন্য আলাদা সিংগেল কেবিনের ব্যবস্থা করেছে ওদের বন্ধুরা। আর পাশের একটা ডাবল কেবিনে বাকি চারজন। শিশির কেবিনে ঢুকেই অবাক। 

উপরে একটা বেড নিচে একটা বেড। সত্যিই খুবই সুন্দর। বিন্দু কেমন জানি লজ্জা লাগতে লাগল। বিয়ের পরে এই প্রথম দুইজনে একসাথে। তুলি হাসতে হাসতে বলল,
___ " এই রাত আর কিন্তু আসবে না "।
চলবে
মারিয়া আফরিন নুপুর

By commenting you acknowledge acceptance of Whatisloved.com-Terms and Conditions

Post a Comment

By commenting you acknowledge acceptance of Whatisloved.com-Terms and Conditions

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post